জান্নাতুল ফেরদৌস সায়মা:
করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে আমাদের দেশের মানুষ বর্তমানে ঘরে অবস্থান করেছে। এবং দারিদ্র্য সীমায় নেমে এসেছে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ পরিবার। আর গত মার্চ মাস হতে পারিবারিক সহিংসতার হার দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনা মহামারীতে বিগত ৫ মাসে সমগ্র দেশে পারিবারিক সহিংসতার স্বীকার হয়েছে প্রায় ৬১ শতাংশ শিশু। ৪০% পরিবারে পূর্বে কখনো পারিবারিক সহিংসতার মত এ ধরনের সমস্যাই দেখা দেইনি।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর করা জরিপে দেখা গিয়েছে মোট ৬৩,৯৬৮ জন মহিলা ও শিশুর সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৪,৮৭৫ জন মহিলা এবং ১৯,০৯৩ জন শিশু ছিল। জুলাই মাসে মহিলা ও শিশু সহ মোট ভিকটিমের সংখ্যা ছিল ১১,৮৭১ এবং জুনে ১২,৬৪০ জন।
করোনার কারণে যেসকল বিরূপ প্রভাব দেখা দিয়েছে তার মধ্যে একটি সমস্যা হল মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব। দীর্ঘদিন লকডাউনের কারণে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আর্থিক দৈন্যতা, বেকারত্ব, চাকরির অনিশ্চয়তা এমনকি মাদকাসক্তির মত কারণে মানুষ চরম মানসিক বিপর্যয়ের স্বীকার হচ্ছে। যা মনে প্রতিনিয়ত রাগ, হতাশা ও পারস্পরিক বিরোধ সৃষ্টি করছে।
আগে যে পরিমাণ অর্থে কর্তা পরিবার পরিবার চালনা করত, মহামারীর কারণে তা অনেকটাই কমে এসেছে এবং অনেক পরিবারের অর্থসংস্থানই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই পরিবারের সবার ওপর এটা গুরুতর চাপ সৃষ্টি করেছে যা সদস্যদের একে অপরের প্রতি মনোমালিন্য ও বিরূপ ধারণার জন্ম দিচ্ছে।
অর্থাৎ, বেকারত্ব, চাকরী চলে যাওয়া, সামাজিক দূরত্ব এবং দারিদ্র্যতার কারণেই বর্তমান পারিবারিক সহিংসতার পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পাচ্ছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এসব ব্যক্তি তথা পুুরুষ সদস্যের মারাত্মক প্রতিক্রিয়া পরিবারের তুলনামূলক দূর্বল সদস্য যেমন স্ত্রী, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠ পিতা-মাতা ভোগ করে।
সবাই ঘরে থাকছে বলে নারীর যাবতীয় সাংসারিক কাজের পরিমাণ কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রমবর্ধমান পারিবারিক সমস্যার ফলে নারী ও শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য চরম খারাপ হয়ে পড়ে, সর্বশেষ যা আত্মহত্যায়ও রূপ নিতে পারে। অনেক সময় তা নতুন সামাজিক অপরাধ সৃষ্টি করে।
এক জরিপ মতে, যেখানে ২০১৯ সালে মোট এসিড নিক্ষেপের সংখ্যা ১৬ টি সেখানে গত ৫ মাসে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। সারাদিন ঘরে থাকায় পরিবারের সদস্য কিংবা নিকটাত্মীয়ের দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
সহিংসতার ঘটনা আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়, বরং এটা হাজার বছরের লালন করা মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি। যেখানে আমাদের সমাজে নারী-পুরুষ উভয়ই কোভিড-১৯ এর কারণে বিপর্যস্ত, সেখানে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুরুষ সদস্য তার হতাশা, রাগ, আক্ষেপের কারণে নারীর ওপর যে ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করছে, অপরপক্ষে একজন নারীর পক্ষে তা সম্ভব হয়না। এমনকি যেসকল পরিবারে নারী অর্থের যোগান করতো, সেসকল পরিবারেও বর্তমানে অর্থের যোগান দিতে না পারায় সহিংসতার স্বীকার হচ্ছে।
পারিবারিক সহিংসতার স্বীকার নারী ও শিশু পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন,২০১০ এর মাধ্যমে নিজেকে সুরক্ষিত করতে পারে। এ আইনে বলা আছে, পারিবারিক সম্পর্ক আছে এমন কোনো ব্যক্তি কর্তৃক পরিবারের অপর কোনো নারী বা শিশু সদস্য শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন কিংবা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলে এ ধারার অধীনে উক্ত নারী বা শিশু আইনের আশ্রয় গ্রহণ করতে পারবে।
মূলত, নারী-পুরুষের প্রতি আচরণ, অধিকার ও ক্ষমতায়নের পার্থক্য সামাজিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করছে।এ কারণে এ ধরনের সমস্যা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকবে। পারিবারিক সহিংসতার স্বীকার নারীর পক্ষে আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় এবং ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করে আইনের আশ্রয় নেয়াও সম্ভব হচ্ছে না। লকডাউনের কারণে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়াও প্রায় অসম্ভব। তাই, দিনদিন এ সমস্যা আরও বেড়ে চলেছে।
দীর্ঘদিন মহামারীর কারণে সবার মধ্যেই মানসিক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে তাই পরিবারে সবার সাথে সমান ও সহানুভূতিশীল আচরণ এ ধরনের সমস্যা অনেকটা কমিয়ে আনতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের হেল্পলাইন ব্যবস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে, যেন টেক্সট মেসেজ ও ফোন কলের মাধ্যমে সহজেই এ ধরনের সমস্যা প্রতিকার, প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। সহিংসতার শিকার নারী ও কন্যাশিশুদের আশ্রয় প্রদানের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
সর্বশেষ, আমরা নিজে ও আশেপাশের সবাইকে পারবারিক সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করে শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতা কমাতে অংশ নিতে উৎসাহিত করতে পারি। তার সাথে পরিবারের সকল সদস্যদের নারীপুরুষের ক্ষেত্রে সমআচরণ করার মনোভাব গড়ে তুলতে পারি।
আগামী কয়েকমাসে সারাদেশে সাড়ে ৩ কোটির কাছাকাছি শিশু জন্মগ্রহণ করবে, ভবিষ্যতে সহিংসতা এড়াতে নারী-পুরুষের মধ্যকার তারতম্য দূর করার পারিবারিক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। ফলে, শুধু সহিংসতাই থামবে না,বরং অনেক জীবন বাঁচবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।