কক্সবাজারের টেকনাফে একই জমি এক মাসের ব্যবধানে দুই ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে আলাদা দলিলে রেজিস্ট্রি করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় একটি প্রভাবশালী চক্র ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের যোগসাজশের অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
লিখিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র থেকে জানা যায়, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের গোদার বিল এলাকার একটি জমি চলতি বছরের ৭ এপ্রিল হেবা দলিলের মাধ্যমে রহিম উল্লাহ তার ভাই মো. আব্দুল হাশিমের কাছে দেন। এর প্রায় দেড় মাস পর, ২৩ মে একই জমি গফুর আলমের নামে আরেকটি দলিল করা হয়।
অভিযোগকারী আব্দুল হাশিমের দাবি, ৭ এপ্রিলের দলিলের মাধ্যমে তিনি জমিটির মালিক হন। পরে সরকারি নিয়ম মেনে জমির নামজারি ও খতিয়ানও সম্পন্ন করেন। এরপরও আগের দলিলের বিষয়টি গোপন করে একই জমি অন্য ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
আব্দুল হাশিম অভিযোগ করেন, টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কর্মকর্তা অভিজিৎ কর, কয়েকজন দলিল লেখক এবং একটি প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে টাকার বিনিময়ে এই দ্বৈত রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।
তবে জমির দাতা রহিম উল্লাহর বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, আব্দুল হাশিম আমার কাছ থেকে ৬ কড়া জমি ৪ হাজার টাকা দিয়ে নিয়েছেন। পরে সে আমার নামে রেকর্ড থাকা আরও ৩২ কড়া জমি প্রতারণা করে নিয়ে নেয়। আব্দুল হাশিম আমার সৎ ভাই। সে হেবা সূত্রে আমার জমি নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও আমি আপত্তি জানিয়েছি।
অভিযোগকারী আব্দুল হাশিম বলেন, একই দাগ ও খতিয়ানের জমি প্রথমে আমার নামে দলিল করা হয়। পরে প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় একই জমি অন্য একজনের নামে আবার দলিল করা হয়েছে। এটি পরিকল্পিত প্রতারণা।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গফুর আলম দীর্ঘদিন ধরে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন মানুষের জমি দখল ও আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় এসব কাজ করা হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
আব্দুল হাশিম আরও বলেন, তাকে নিয়মিত হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে অভিযোগকারী গফুর আলম বলেন, দলিল লেখকের মাধ্যমে জমির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে জমিটি ক্রয়ের জন্য দলিল লেখককে দলিল প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়। মিডিয়া করিমের মাধ্যমে রহিম উল্লাহর কাছ থেকে ৩২ কড়া জমি ৭ লক্ষ টাকা জমিটি ক্রয় করি। কিন্তু জমি কেনার আগে রহিম উল্লাহ তার ভাই আব্দুল হাশিমকে ওই জমি হেবা করে দিয়েছেন, বিষয়টি আমার কাছে তথ্য গোপন করা হয়েছে। আগে হেবা দেওয়ার কথা জানলে আমি জমিটি ক্রয় করতাম না।
তিনি বলেন, একই জমি আগে অন্য কারও নামে দলিল হয়ে থাকলে পরে করা দলিল আইনগত ভাবে টেকসই হয় না। আমি সরকারকে নিয়ম অনুযায়ী রাজস্ব দিয়ে জমিটি কিনেছি। রহিম উল্লাহ তার ভাইকে জমি দেওয়ার বিষয়টি গোপন করে আমার কাছে জমি বিক্রি করেছেন। তাই এর দায়ভার রহিম উল্লাহকেই নিতে হবে।
জমিটির মালিকানা নিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জমিটির মূল মালিক ছিলেন নছরতজ্জমা। তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে জমিটি ধলা বিবি ও পরে তার উত্তরাধিকারীদের কাছে যায়। ১৯৮৫ সালে এজাহার মিয়ার কাছ থেকে খুইল্যা মিয়া জমিটি কেনেন। পরে বিএস খতিয়ানে তার মালিকানা চূড়ান্ত হয়। খুইল্যা মিয়ার মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ হয়।
টেকনাফ উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম বলেন, টেকনাফে শিক্ষার হার তুলনামূলক কম। তাই জমি বিক্রির আগে আগের মালিকানা ও বিক্রির তথ্য যাচাই করা খুবই জরুরি। জমি রেজিস্ট্রির আগে আগের বিক্রির তথ্য যাচাইয়ের নিয়ম থাকলেও অনেক সময় তা ঠিকভাবে করা হয় না।
তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের পাশাপাশি দলিল লেখকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সবাই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করলে ক্রেতা-বিক্রেতা হয়রানি থেকে রক্ষা পাবেন এবং জমি কেনাবেচায় স্বচ্ছতা থাকবে।
একই দাতার জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে দলিল করার বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কর্মকর্তা অভিজিৎ কর সংবাদকর্মীর সঙ্গে অসহযোগিতামূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজেকে ম্যাজিস্ট্রেটের সমান দাবি করেন এবং সংবাদকর্মীর মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়ার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিজিৎ কর বলেন, তাদের কার্যালয়ে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। কে কখন জমি রেজিস্ট্রি করছেন, তা নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা নেই। তারা সর্বশেষ খতিয়ান যাচাই করে দলিল সম্পন্ন করেন। সারা বাংলাদেশে একই নিয়মে জমি রেজিস্ট্রি হয়, টেকনাফের জন্য আলাদা কোনো নিয়ম নেই।
তিনি বলেন, একজন দাতা একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করছেন কি না, তা অনলাইনে তথ্য না থাকলে সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। দলিল লেখকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়।
অভিজিৎ কর আরও বলেন, সর্বশেষ খতিয়ানে যার নাম রয়েছে, তিনি সেই খতিয়ানের ভিত্তিতে জমি বিক্রি করতে এলে তাকে রেজিস্ট্রি করতে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। ওই ব্যক্তি আগে আরও কারও কাছে জমি বিক্রি করেছেন কি না, সেই তথ্য সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে সংরক্ষিত না থাকলে বা অনলাইনে দেখা না গেলে তা যাচাই করা সম্ভব নয়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, টেকনাফে জমি জালিয়াতি ও একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রির ঘটনা নতুন নয়। প্রভাবশালী চক্র ও অসাধু দলিল লেখকদের কারণে অনেক ভুক্তভোগী বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে সাহস পান না। ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও অনেক সময় তা আড়ালেই থেকে যায়।