ভয়েস ওয়ার্ল্ড ডেস্ক:
জানে আলম স্বপন (৫৫)। কাগজে-কলমে কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) ড্রাইভার হিসাবে কর্মরত। অথচ এক যুগ ধরে স্টার লাইন পরিবহণে চাকরি করে যাচ্ছেন তিনি। এতে সরকারি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেতে তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। এমনকি তার বিরুদ্ধে মাদক কারবারে জড়িত থাকার জনশ্রুতিও রয়েছে। অল্প সময়ে হয়েছে অঢল সম্পদের মালিকও।
অপরদিকে দীর্ঘ এক যুগ ধরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি চলছে বহিরাগত চালক দিয়ে। এই উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা হয়ে যিনি আসেন, তার গাড়ির চালকের জোগান দেন জানে আলম স্বপনই।
অভিযোগ আছে, গাড়ি না চালালেও উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে তদবির বাণিজ্যের সঙ্গে বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন স্বপন। একই সঙ্গে চাকরির সুবাদে পরিবহণ সেক্টরের মাদকের নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। তার সিন্ডিকেটের অনেকেই ধরা পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। অবৈধ টাকায় একাধিক বিলাশবহুল বাড়িসহ অঢেল সম্পদের মালিকও হয়েছেন তিনি।
এদিকে তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ সামনে আসার পর ব্যবস্থার পরিবর্তে রহস্যজনকভাবে জানে আলম স্বপন যেন কোনো সমস্যায় না পড়েন, সে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছেন সদর উপজেলার বর্তমান নির্বাহী কর্মকর্তা।
অনুসন্ধান ও উপজেলা পরিষদের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৮ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে গাড়িচালক স্বপন তার পরিবর্তে নুরুল আলম মনিয়া নামের একজনকে চালক নিয়োজিত করেন। এরপর বেশ কয়েকজন চালক পরিবর্তন করেন। আর ৬ বছর ধরে গাড়িচালক হিসাবে আছেন তার ভাই মনজুর আলম।
জানা যায়, ১৯৮৪ সালের ১০ মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়িচালক পদে যোগদান করেন স্বপন। চাকরিতে বহাল থেকে ২০০৮ সাল থেকে স্টার লাইন পরিবহণের (কক্সবাজার) চাকরি নেন। ২০১৫ সালে মহাব্যবস্থাপক হিসাবে পদোন্নতি হয় তার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলায় কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার বাসনা থেকে জানে আলম স্বপন মাদকের ব্যবসার জন্য পরিবহণে চাকরি নেন। কক্সবাজারের ইয়াবা কারবারিদের মাদক রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। একই সঙ্গে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে তদবির বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা যায়, গত বছর স্বপনের ছেলে ফাহিম এবং মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য মিজান স্টার লাইন পরিবহণে করে ঢাকা যাওয়ার সময় চট্টগ্রামের সিটি গেট এলাকায় পুলিশের চেকপোস্টে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ আটক হন। পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেলে ফাহিমকে ছাড়িয়ে নেন। মাদক মামলায় জেলে যেতে হয় মিজানকে। এছাড়াও মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চাকরি গেছে স্বপনের ভাই কক্সবাজার জেলা পরিষদের গাড়িচালক কামরুলের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্টার লাইন পরিবহণের একজন কর্মচারী দাবি করেন, কক্সবাজার লাইনের পরিবহণের যেসব ড্রাইভার মাদক নিয়ে ধরা পড়েছে, তারা প্রায় সবাই স্বপন সিন্ডিকেটের সদস্য।
কথা হয় ইয়াবাসহ ধরা পড়ে কারাবরণ করা কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের দাবি-গাড়িচালক স্বপনের মাধ্যমে পরিবহণে করে মাদকের চালান পাঠালে সহজে তা ধরা পড়ে না। রহস্যজনক কারণে ওই গাড়ি তল্লাশি করা হয় না। তারাও একাধিকবার স্বপনের মাধ্যমে ইয়াবার চালান পাঠিয়েছেন।
জানা যায়, জানে আলাম স্বপন অবৈধ পন্থায় সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। কক্সবাজার শহর প্রবেশমুখ সদরের ঝিলংজা ডিক্কুলে নিজের নামে ক্রয়কৃত ৪০ শতক জমিতে বহুতল ফাউন্ডেশন দিয়ে ১ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। সদরের ঝিলংজা পশ্চিম হাজীপাড়া এলাকায় মেয়ের নামে ২০ শতক জমিতে ৭ তলা আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন। একই এলাকায় আরেকটি ২ তলা বাড়ি করেছেন। এছাড়াও কক্সবাজার শহরের কলাতলিস্থ সরকারি কর্মচারীদের ৫১ একর প্লটে নিজের নামে একটি, স্ত্রীর নামে একটি, মেয়ে ও ভাইয়ের নামে দুটিসহ ৪টি প্লট কিনেছেন স্বপন। ফেনীতে থাকা স্বপনের আত্মীয়স্বজনের দাবি, খালা ও বিশ্বস্ত দুঃসম্পর্ক আত্মীয়দের নামে প্রায় ২০ একরের বেশি জমি ক্রয় করেছেন।
তবে অভিযোগ স্বীকার করেছেন আলম স্বপন। তিনি বলেন, আমি অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ইউএনও স্যারের গাড়ি চালাতে যাই না। এজন্য নিজের ভাইকে সেখানে গাড়িচালক হিসাবে দিয়েছি। স্টার লাইনে চাকরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্টার লাইনের মালিক আলাউদ্দিন আমার মামা। তাই ওনার অনুরোধে সেখানে চাকরি করছি। ২০ হাজার টাকা করে সেখান থেকে বেতন পাই। তবে এখন বুঝতে পেরেছি এটা ভুল হয়েছে।
এজন্য আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাই। মাদক ও তদবির বাণিজ্যে জড়িত থাকার বিষয়ে অস্বীকার করে স্বপন বলেন, যে পরিমাণ সম্পদের কথা বলা হচ্ছে, আমার আসলে কিছু নেই।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও মিল্টন রায় বলেন, আমিও আসলে প্রথমে জানতাম না আমার গাড়িচালক কে? পরে বিষয়টি জানতে পারি আমার ড্রাইভার অন্য আরেকজন।
এক যুগ ধরে চাকরিতে অনুপস্থিতি ও অন্যত্র চাকরি করা প্রসঙ্গে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, গত মাসে জানে আলম স্বপন অসুস্থ বলে জানিয়ে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। তার আবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিব।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদর উপজেলার একজন সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, গাড়িচালক স্বপনের দীর্ঘদিন অনুপস্থিতি ও প্রাইভেট কোম্পানি চাকরির বিষয়টি জানতে পেরে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করি। পরে ঊর্ধ্বতন মহলের চাপের কারণে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়িচালকের এক যুগ ধরে চাকরিতে অনুপস্থিতি ও অন্যত্র চাকরি করার প্রসঙ্গে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিন আল পারভেজ বলেন, বিষয়টি সত্য হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রশাসন রফিকুল ইসলাম বলেন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ড্রাইভার জানে আলম স্বপন মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্র-যুগান্তর।