ভয়েস ওয়ার্ল্ড ডেস্ক:
জাতীর কাছে ক্ষমা চেয়ে ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আত্মসমর্পন করেছিলেন ইয়াবা সম্রাট টেকনাফের সদর ইউনিয়ের ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য এনাম মেম্বার। কালের আবর্তে পরিস্থিতি বদলে গেলে ফের জামিনে বের হয়ে আসে দুর্ধর্ষ এই মাদক সম্রাট।
বন্দুকযুদ্ধে নিহত দেশের শীর্ষ ইয়াবা মাফিয়া হাজী সাইফুলের ডানহাত খ্যাত এনাম মেম্বার পূর্বেকার সমস্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ পূনরুদ্ধার করে নতুন করে নব উদ্যোমে সারা দেশে পাচার করে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য মতে সদ্য অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনের প্রথম দফায় অংশ গ্রহণ করেন তিনি। ওই নির্বাচনে কমপক্ষে কয়েক কোটি টাকা বিলিয়ে পুনরায় ভাগিয়ে নেন জনপ্রতিনিধির পদটি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সারা দেশব্যাপী একটি মাদকের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন এনাম। আত্মমর্পন কালে ওই সিন্ডিকেটের হাতে পুরো নেটওয়ার্কের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নির্বিঘ্নে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যান। ফলে কারাগারে থাকাকালীন প্রতিদিন লাখ টাকা খচর করতেন তিনি। কালো টাকার জোগান থাকায় জামিনে বের হতেও বেগ পেতে হয়নি তার। কারাগার থেকে বের হয়ে কিছুদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রনে নেন।
রীতিমতো বনে যান জনপ্রতিনিধিও। এনামের সাথে আত্মসর্পনকারী অনেক মাদক ব্যবসায়ী জামিনে বের হয়েছে। যারা পুনরায় মাদক পাচার করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ইয়াবা ও আইসসহ আবারও আটক হয়েছে। কিন্তু এনামও তারমতো গডফাদাররা সুযোগে আত্মসর্পন ছাড়া অতীতে যেমন কখনো আটক হয়নি, এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে মাদকের বিস্তার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। নির্বিঘ্নে চলতে থাকা এই মাদক কারবারে কেউ বাঁধা হয়ে দাড়ালে বিদেশী অস্ত্রসহ প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে দেখা যায় বলেও জানিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা।
একটি বিশ্বস্থ সূত্র থেকে জানা যায়, এনামের রয়েছে দুটি রোহিঙ্গা মাদক পাচারকারী দল। তারাই টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও উখিয়ার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন পালংখালী থেকে বিপুল সংখ্যক মাদক প্রবেশ করায়। পরবর্তীতে এনাম মাদকগুলো তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পাইকারি ও খুঁচরা ব্যবসায়ীদের হাতে সুকৌশলে পৌঁছে দেন। মাদকগুলো বহন করার কাজে বিলাসী চাহিদা সম্পন্ন উঠতি বয়সী যুবক-যুবতী, এনজিও কর্মী ও বেকারদের সহ কমপক্ষে শতাধিক লোকজনকে তার এই কাজে সহযোগী হিসেবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। মাঝেমধ্যে ওই পাচারকারী দলের কেউ আটক হলেও বরাবরেই অধরা থেকে যান এনাম মেম্বার।
এদিকে অনুসন্ধানে আরোও জানা যায়, এনাম ২০১২ সাল থেকে নরসিংদীর আশিক নামে এক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর সাথে অংশীদারীমূলক ইয়াবা বানিজ্য করে আসছেন। গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এনাম নরসিংদীতে ওই আশিকের মাধ্যমে প্রতিমাসে ১০ লাখ পিসেরও অধিক ইয়াবা সরবরাহ করেন। আশিক সিলভার রংয়ের একটি প্রিমিও গাড়ি যোগে কয়েকদিন পর পর টেকনাফে গমন করেন এবং এনামের সাথে দেখা করেন। দেখা করার সময় আশিক সরাসরি সামনে না এসে তার গাড়ির ড্রাইভার আব্দুলের মাধ্যমে এনামের সাথে যোগাযোগ ও লেনদেন সম্পন্ন করেন।
আশিকের ব্যাপারে জানা যায়, এনামের ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে তিনি নরসিংদী ডিবি পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে একটি পা হারান। ওই পায়ে একটি প্লাস্টিকের পা সংযুক্ত করা হয়েছে এবং তিনি খুড়িয়ে হাটেন। কিন্তু আশিক শারিরিকভাবে অক্ষম হওয়ায় তার ড্রাইভার আব্দুলের নেতৃত্বে নরসিংদীতে ইয়াবা বানিজ্য টিকিয়ে রাখতে সিএনজি চালকদের সমন্বয়ে এনাম নতুন একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন। যারা প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গাউছিয়া থেকে মাধবদি পর্যন্ত প্রধান সড়কে অবস্থান নিয়ে খুচরা মাদক ব্যবসায়ীদের ইয়াবা সরবরাহ করেন। এভাবে করে প্রতিমাসে শুধুমাত্র নরসিংদীতেই ১০ লক্ষাধিক ইয়াবা পাচার করেন এনাম মেম্বার।
জানা যায়, এনামের ভাই দেশের বাইরে রয়েছে। তারাই মুলত এনাম মেম্বারের মুল সহযোগী ও ইয়াবা ব্যবসায় আর্থিক যোগানদাতা হিসেবে কাজ করছেন।
এবিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত এনাম মেম্বার প্রতিবেদকের সাথে অসংলঘ্ন আচরণ করেন। বক্তব্যে তার বর্তমান জীবন-জীবিকায় আয় ব্যায়ের অসামঞ্জস্য চিত্রও উঠে আসে। এছাড়াও আত্মসর্পনের আগে তিনি মাদক পাচারের সাথে জড়িত ছিলেন বলে স্বীকার করলেও বর্তমানে তিনি কোন প্রকার মাদক পাচারের সাথে জড়িত নন বলে দাবী করেন।
এনাম মেম্বারের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বলেন, যেহেতু অভিযুক্ত ব্যাক্তি আগেও মাদক ব্যবসায় জড়িত ছিল জামিনে ফিরে আসার পর থেকে তাদের গতিবিধি নজরে রাখা হয়েছে। এছাড়াও টেকনাফের প্রায় ঘরে মাদক সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তথ্যের ঘাটতি থাকায় অনেক সময় তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়না। তিনি সাংবাদিক, দেশপ্রেমিক ও নিষ্ঠাবান নাগরিকদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।