জসিম উদ্দিন
ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে বার বার ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার এক কলেজছাত্রী। এক পর্যায়ে অতিষ্ট হয়ে ধর্ষণ থেকে বাঁচতে যোগাযোগ বিছিন্ন করেন দেন ওই তরুণী। এতেই ক্ষুদ্ধ হয়ে ভুক্তভোগীর বাবাকে ফোন করে বসেন ধর্ষক। প্রস্তাব দেন এক ঘন্টার জন্য মেয়েকে তার কাছে পাঠাতে। এ সময় মেয়েকে ৬৪ বার ধর্ষণ এবং তারমধ্যে ২১ বার ভিডিও ধারণ করার বর্ণনাও তরুণীর বাবাকে দেন ধর্ষক। মেয়েকে না পাঠালে ভিডিও গুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমিও দেন এই ধর্ষক।
এ ঘটনায় অসহায় পরিবারটি সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হবার ভয়ে তা প্রকাশ না করলেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এক পর্যায়ে স্বপরিবারে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। ধর্ষণের ঘটনার হুমকি ও কথোপকথনের অডিও প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
অভিযুক্ত ধর্ষক মঈন উদ্দীন হাসান ওরফে বাধঁন চট্রগ্রামের লোহাগাড়া বড় হাতিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড লস্কর পাড়ার মৃত ওবাইদুল হাকিমের ছেলে। লোহাগাড়ায় একসময় দাপটে শিবির ক্যাড়ার হিসেবে পরিচিত ছিলেন বাঁধন। কিন্তু নারী কেলেংকারির কারণে তাকে শিবির থেকে বহিষ্কার করা হয়।
ভুক্তভোগী মেয়ের বাবা বলেন, ২০১৭সালে সালে বাঁধনের সঙ্গে মোবাইলে তার রং নাম্বারে পরিচয় হয়। এর সূত্রধরে তিনি কুতুবদিয়া মালেক শাহ হুজুরের মাজারে আসলে সেখান থেকে আমাদের বাড়িতেও আসেন।
তিনি আরও বলেন, “বাঁধন সাতকানিয়া সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীনের ভাগিনা ও বাচ্চু মিয়ার ভাতিজা পরিচয় দিয়ে নিজেকে অবিবাহিত দাবি করে আমার কলেজে পড়ুয়া মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এক পর্যায়ে তার বাবা মা ও ভাই বন্ধু পরিচয়ে কয়েকজন আমার বাড়িতে মেয়ে দেখতে আসেন এবং পছন্দ করেন। ওই সময় কাতার প্রবাসী বাঁধনের মেজ ভাই ফোনে দিন তারিখ ঠিকঠাক করবেন বলে জানিয়ে চলে যায় তারা। এর পরেই এ লম্পটের থাবা শুরু হয়।”
ভুক্তভোগী মেয়েটি প্রতিবেদককে জানান, কাতার প্রবাসী বাঁধনের ভাই দেশে আসলে বিয়ের অপেক্ষার এক পর্যায়ে মোবাইলে বাধনের সঙ্গে সু-সম্পর্ক গড়ে উঠে। ২০১৯ সালের প্রথম দিকে বাঁধন তাদের বাড়িতে আসেন। বাবা মায়ের অনুপস্থিতির সুযোগে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এবং তার অজান্তে মোবাইলে অশ্লীল ভিডিও ধারণ করেন। বিয়ে হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে লম্পট বাঁধন কাউকে কিছু না জানাতে তাকে নিষেধ করেন।
মেয়েটি আরও জানান, বাঁধনের চরিত্র খারাপ দেখে তার ব্যাপারে খোঁজ নিতে বাঁধনের এলাকায় যান তার পিতা। কিন্তু বাঁধন জরুরী কাজে ঢাকায় গেছেন জানিয়ে আর দেখা করেননি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন বাঁধন ২০০৭সালে বিয়ে করেছেন এবং তার দুটি ছেলে মেয়ে আছে। তাকে দেখতে আসা মা-বাবা ঠিকানা অনুযায়ী বাড়িঘর ও প্রবাসি ভাই সব ছিল বাঁধনের সাজানো নাটক। অভিভাবক নাটকের অডিও সংরক্ষিত আছে প্রতিবেদকের কাছে।
এত কিছু সামনে আসলেও লম্পট বাঁধনের হাত থেকে রক্ষা পাননি মেয়েটি।
ভুক্তভোগী মেয়েটি আরও জানান, ধর্ষণের অশ্লীল ভিডিও ফাঁস করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষক বাঁধনের ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য করেন। এবং তাকে মুক্তি দেয়ার আশ্বাসে পর্যাক্রমে প্রায় ৫ লাখ টাকা নেন বাঁধন। মুক্তির বদলে ভেঙে দেন তার চুপিসারে ঠিক হওয়া ৫টি বিয়ে। একসময় অতিষ্ঠ হয়ে তিনি মোবাইল ফোন হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার বন্ধ করে দেন।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে স্বয়ং মেয়েটির জন্মদাতা পিতার কাছে ফোন করে অশ্লীল ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে এক ঘন্টার জন্য তার কাছে মেয়েকে পাঠানোর প্রস্তাব দেন লম্পট বাঁধন। তাতে কাজ না হওয়ায় কথামত একাধিক ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে তরুনীর অশ্লীল ছবি পোস্ট করেন।
এরই প্রেক্ষিতে নির্যাতিতা মেয়েটির বাবা ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি ও মেয়েটি নিজে ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারীতে পৃথক সাধারণ ডায়রী করলে চাপে পড়ে অল্পদিনের মধ্যে সৌদি আরবে পালিয়ে যান এই লম্পট। সেখানে গিয়ে আরও হিংস্র হয়ে ওঠে ধর্ষক।
সৌদিতে বসে মোবাইলে ভুক্তভোগী স্বপরিবারে হত্যার পাশাপাশি মেয়েটির অশ্লীল ভিডিও এবং ছবি পাঠিয়েছেন কয়েকজন লম্পট ব্ল্যাকমেলারদের কাছে। তারাও অসহায় মেয়েটিকে ভিডিও ফাঁস করার ভয়ে দেখিয়ে কু-প্রস্তাব দেন। তাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে দাবি করছেন মোটা অংকের টাকা। এই অডিও রেকর্ডও সংরক্ষিত আছে।
এমতাবস্থায় অসহায় পরিবারটি প্রধানমন্ত্রী ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এঘটনার সু-বিচার দাবি করেন ভুক্ত মেয়ে ও তার পরিবার।
লম্পট বাঁধনের ইতিহাস এখানে শেষ নয়। একইভাবে আরও একাধিক মেয়ের সর্বনাশের পাশাপাশি স্বর্ণালংকার ও টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত বাধঁন, হোয়াটসঅ্যাপে প্রতিবেদককে তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হলে মেয়েটির সমস্ত অশ্লীল ভিডিও দেশের সব টিভি চ্যানেলে প্রচার করা হবে বলে হুমকি দেন।
কুতুবদিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি দিদারুল ফেরদৌস বলেন, পরিবারটি জিডি করেছিল ঠিক কিন্তু এতকিছু কখনো বলেনি। তিনি ভুক্তভোগী পরিবারকে সর্বোচ্চ আইনি সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন
বিষয়টি নজরে আনা হলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, পরিবারটিকে সর্বোচ্চ আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি প্রচলিত আইন অনুযায়ী এই লম্পট এর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। তিনি নিকটতম থানায় সংশ্লিষ্ট আইনে অভিযুক্তের জন্য মামলা করতে পরিবারটিকে অনুরোধ জানান।