বিশেষ প্রতিনিধি
১০/১৫ জন শ্রমিক দিয়ে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে নদীতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট প্যারাবনের গাছ। ধ্বংস করা হচ্ছে প্যারাবনে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল। অন্যদিকে ডাম্প ট্রাকে করে মাটি ও বালি এনে প্রকাশ্যে ফেলা হচ্ছে নদীতে। সমানতালে চলছে নদী ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের কর্মকান্ডও। বাঁকখালী নদীর কক্সবাজার শহরের কস্তুরাঘাটের বদরমোকাম জামে মসজিদ পয়েন্টে নদী দূষণ ও দখলের এমন কর্মযজ্ঞ চলছে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এমন দখলযজ্ঞ চলতে থাকলেও গত ১৫ দিনে সেখানে অন্তত ১০ টি অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছে দখলদাররা। আর অবৈধ দখলদারদের নেপথ্যে সহযোগিতা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে খোদ ভূমি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘এনভায়রনমেন্ট পিপল’ এর প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, ‘স্থানীয়দের মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় নদী দূষণ ও দখলের ভয়াবহ চিত্র। সেখানে প্যারাবনের গাছ কেটে নদী ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ কাজ চলছে প্রকাশ্যে।’ মি. রাশেদুল মজিদ অভিযোগ করে বলেন,’মৌখিক ও লিখিতভাবে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে অভিযোগ দেয়া হলেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়না। ক্ষেত্রবিশেষে উল্টো ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা দখলদারদের নেপথ্যে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। যার কারণে নদী দখল বন্ধ হচ্ছে না।’ তিনি দ্রুত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর প্রকৃতি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার দাবি জানান।

ট্রাকে মাটি ফেলে এভাবে ভরাট করা হচ্ছে বাঁকখালী নদী। ছবি: ভয়েস ওয়ার্ল্ড।
গত কয়েকদিন ধরে বাঁকখালী নদীর কস্তুরাঘাটের বদরমোকাম জামে মসজিদ পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায় নির্বিচারে প্যারাবন কেটে ডাম্প ট্রাকে করে মাটি এনে ভরাট করা হচ্ছে। একই সাথে নির্মাণ করা হচ্ছে স্থাপনা। অনেক দখলদার সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছেন। এমনকি দখলদাররা প্যারাবনের পাখি শিকার ও পাখির আবাসস্থল ধ্বংসের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, মহেশখালীর রুকন, আমির আলী, রুমালিয়ারছড়ার নুরুল ইসলাম, কামাল মাঝি, শিবলু, কপিল, সানাউল্লাহ, আলম, ইব্রাহিম, ইউসুফ, মালেক, সাইফুল সহ ১০/১৫ জন দখলদার গত ১৫ দিনে প্যারাবনের অন্তত ১৫ হাজার গাছ কেটে নিয়েছে। তারা সেখানে নদী ভরাট করে ৮/৯ টি স্থাপনা গড়ে তুলেছে। তাদের সাথে দখল কার্যক্রমে প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন লোক জড়িত বলে জানা গেছে।

বাঁকখালী নদী ভরাট করে চলছে স্থাপনা নির্মাণ। ছবি: ভয়েস ওয়ার্ল্ড।
স্থানীয়রা আরও জানান, কস্তুরাঘাটের বদরমোকাম হয়ে খুরুশকুল সংযোগ সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে মূলত নদী দখল কর্মকান্ড শুরু হয়। নির্মাণাধীন সেতুর উভয়পাশে চলছে প্যারাবন উজাড় করে নদী দখল ও ভরাট। যেখানে এখনও নদীর জোয়ার-ভাটা চলছে সেখানে ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে স্থাপনা। নদী ভরাট করতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বিশাল প্যারাবন কেটে ফেলা হচ্ছে। প্যারাবনে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে। এসব প্যারাবন দখল-বেদখল নিয়ে দখলদারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতও চলছে।
তবে বেশ কয়েকজন দখলদার দাবী করেন, যেসব জায়গা তারা দখল করছেন তার অধিকাংশই ব্যক্তি মালিকানাধীন। এর স্বপক্ষে খতিয়ান ও সর্বশেষ বছরের খাজনা পরিশোধের দাখিলাও তাদের রয়েছে। কিন্তু প্যারাবন কেটে নদীর জোয়ার-ভাটায় ভরাট করে জমির শ্রেণি পরিবর্তনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কোন অনুমোদন তারা দেখাতে পারেন নি।
নুরুল ইসলাম নামের এক দখলদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি। এখানে কয়েকশ একর জমি অন্তত ২/৩ শ লোক কিনে নিয়েছে। তবে তিনি প্যারাবন কাটার সাথে জড়িত নন বলে দাবি করেন।
আমির আলী নামের আরেক দখলদার বলেন,’আমি ১৪ শতক জমি কিনে নিয়েছি। তবে প্যারাবন আমি কাটিনি।’
নির্বিচারে প্যারাবন কাটা, পাখির আবাসস্থল ধ্বংস ও নদী ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন,’অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সত্যতা পেয়েছি। দ্রুত এসব উচ্ছেদ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আমিন আল পারভেজ এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে জানান।