• শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম
চকরিয়ায় ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যা : ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিলেন ‘কালু ড্রাইভার’ কর্মস্থল কক্সবাজার : প্রজেক্ট ম্যানেজার পদে নিয়োগ দেবে সেভ দ্য চিলড্রেন কক্সবাজারসহ ৫ জেলায় ভারি বৃষ্টি ও ভূমিধসের আশঙ্কা ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যাকান্ডে দুই নারীসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা সাগরে ভাসতে থাকা ১৩ জেলেকে উদ্ধার করল কোস্টগার্ড চকরিয়া ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যা : হুমকির অডিও ঘিরে চাঞ্চল্য কক্সবাজারকে সাজালে বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতি কক্সবাজার ভ্রমণে যাওয়ার পথে সীতাকুন্ডে দুর্ঘটনায় একজন নিহত আসছে টানা ৭ দিন ছুটির সুযোগ জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানের বায়োতে যা লেখা হয়েছে

গাইনী বিশেষজ্ঞদের সিজার বাণিজ্য, ‘কসাইখানা’ সী-সাইড

নিজস্ব প্রতিদেক / ৬৭৮ বার ভিউ
আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আজিম নিহাদ ও ফরিদ মোহাম্মদ:

সিজার বাণিজ্যে মেতে উঠেছে কক্সবাজার শহরের চিহ্নিত কিছু গাইনী বিশেষজ্ঞ। গর্ভাবস্থায় বাচ্চার পজিশনের ভুল রিপোর্ট, মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে দ্রুত সিজারে তাগাদা সহ দেখানো নানা কৌশলে জিম্মি করে রোগীদের। হাতিয়ে নেয় হয় লাখ লাখ টাকা।

এমনকি জোরপূর্বক সিজার করতে গিয়ে মা-নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটাচ্ছে চিকিৎসক রূপী এসব কসাইরা। সিজার বাণিজ্যে মেতে উঠা চিকিৎসকদের অন্যতম সহযোগী শহরের সী-সাইড সহ কয়েকটি প্রাইভেট হাসপাতাল।

জামায়াত নিয়ন্ত্রিত সী-সাইড হাসপাতাল সিজার বাণিজ্যে শীর্ষে রয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এক ভুক্তভোগী সী-সাইড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. রফিকুল হাসান সহ তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলা তদন্তের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সিভিল সার্জনকে।

কক্সবাজার সিনিয়র জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহ’র আদালতে তৌহিদুল ইসলাম খোকন নামে এক ভুক্তভোগী বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। তিনি শহরের মধ্যম বাহারছড়ার বাসিন্দা।

মামলার আসামীরা হলেন- গাইনী বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুজ্জামান, ডা. আনিসা ও সী-সাইড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল হাসান।
প্রসূতি রোগীকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রেখে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে টাকা না পেয়ে সিজার না করার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়। তবে পরে অন্য হাসপাতালে ওই নারীর নরমাল সন্তান ডেলিভারি হয় বলে বাদি এজাহারে উল্লেখ করন।

বাদি এজাহারে জানান, তার স্ত্রী ইফতেসাম ইসলাম গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে ডা. আসাদুজ্জামানের অধীনের পর্যবেক্ষণে ছিলেন। এর মধ্যে সন্তান ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে এলে পরামর্শের জন্য ডা. আসাদুজ্জামানের কাছে নিয়ে যান। পরে রোগীকে আসাদুজ্জামান সী-সাইড হাসপাতালে ভর্তি করানো নির্দেশ দেন।

আসাদুজ্জামানের নির্দেশ অনুয়ায়ী, গত ৭ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে রোগীকে সী-সাইড হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে ডা. আনিসার তত্ত্বাবধানে ছিলেন রোগী। এর মধ্যে প্রসব যন্ত্রণা শুরু হলে রাত সাড়ে ৯টার দিকে ডা. আসাদুজ্জামান হাসপাতালে আসেন। তিনি এসেই সিজার করাতে হবে বলে রোগীর স্বামীকে জানিয়ে দেন।

ডা. আসাদুজ্জামের পর ডা. আনিসা ও রফিকুল হাসানও সিজার করতে তাগাদা দেন স্বামীকে। সিজারের জন্য দাবি করে বসেন ৫০ হাজার টাকা। সামর্থ্য না থাকায় ওই চিকিৎসকদের নরমাল ডেলিভারি করার অনুরোধ করেন স্বামী।

কিন্তু তারা (চিকিৎসকেরা) কোনো কথা আমলে না নিয়ে ৫০ হাজার টাকা নেয়ার জন্য অটল থাকে। উল্টো পেটে বাচ্চার পজিশন নিয়ে ভয়-ভীতি দেখায়। দেরি হলে মা-সন্তান দু’জনেরই প্রাণনাশের ঝুঁকি আছে বলে ভয় দেখাতে থাকে। কিন্তু অগ্রিম নগদ টাকা জমা দেওয়া ছাড়া অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) ঢুকানোর অনুমতি দেয়া হয়নি প্রসব যন্ত্রণায় কাতর নারীকে।

এক পর্যায়ে অর্থসংকটের কারণে রাত ১২টার দিকে বাধ্য হয়ে রোগীকে ডুলাহাজারা মালুমঘাট খ্রিস্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে নিয়ে যায় পরিবার। সেখানে নরমাল ডেলিভারি হয়। তবে সময় মতো ডেলিভারি না হওয়ায় মা ও নবজাতকের শারীরিক ক্ষতি হয় বলে জানান সেখানকার চিকিৎসকেরা।

বাদীর প্রধান আইনজীবী অ্যাড. রমিজ আহমেদ ভয়েসওয়ার্ল্ড ২৪.কম কে বলেন, অহেতুক সিজার করার চেষ্টা, সিজারের জন্য মোটা অংকের টাকা দাবি এবং সময় মতো ডেলিভারি না হওয়ায় প্রসূতি ও সন্তানের শারীরিক ক্ষতি হয়েছে। এসব কর্মকান্ড আইনের বিধি মতে অপরাধ। তাই সে ধারা উল্লেখ করে আমার মক্কেল মামলাটি দায়ের করেছেন। মামলাটি তদন্তের জন্য সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দিয়েছেন।

দাবীর উদ্বৃতি দিয়ে রমিজ আহমেদ বলেন, ‘রাত ১১ টার দিকে সী-সাইড হাসপাতালের চিকিৎসকেরা পেইন স্যালাইন প্রয়োগ করে ব্যথা তুলেন। এক পর্যায়ে প্রসব যন্ত্রণা বেড়ে গেলে রোগীর স্বজনকে ভয়-ভীতি দেখানো হয়। দ্রুত সিজার করার তাগাদা দেন। চিন্তা করুন, সিজার বাণিজ্যের জন্য কত নিচু হতে পারে চিকিৎসকের মত মহান ব্যক্তিরা। এই নোংরা মানসিকতা থেকে তাদের বের হয়ে আসা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, লকডাউনে দেশে অধিকাংশই নরমাল ডেলিভারী হয়েছে। কিন্তু এখন কেন অহেতুক সিজার করাতে হবে। যেখানে রোগী নিজে নরমাল ডেলিভারী চাচ্ছেন, সেখানে চিকিৎসকের জোর করে সিজার করানোর চেষ্টা গুরুতর অপরাধ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সী-সাইড হাসপাতাল সিজার বাণিজ্যের গোডাউন। শহর থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে আছে ওই হাসপাতালের বেতনভুক্ত দালালেরা। দালালেরা ফুঁসলিয়ে অথবা বাচ্চাকে নিয়ে ভয়Ñভীতি দেখিয়ে নিরাপত্তার অজুহাত সৃষ্টি করে সী-সাইড হাসপাতালে নিয়ে আসে। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভুল রিপোর্ট দিয়ে সিজার করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রতিটি সিজার থেকে সংশ্লিষ্ট দালাল তার নির্ধারিত কমিশন পায়।

সী-সাইড, কক্স-ন্যাশনাল হাসপাতাল সহ কয়েকটি প্রাইভেট হাসপাতাল সিজার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। রহস্যজনক কারণে সিভিল সার্জনের নিরব ভূমিকার ফলে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এসব প্রাইভেট ক্লিনিক ও গাইনী বিশেষজ্ঞরা।

তবে অনেক ক্ষেত্রে সিজার বাণিজ্যের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে উল্টো জিম্মি করে গাইনী বিশেষজ্ঞরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি প্রাইভেট হাসপাতালের একজন পরিচালক ভয়েসওয়ার্ল্ড ২৪.কম কে জানান, অধিকাংশ সময় গাইনী বিশেষজ্ঞরা আমাদেরকে জিম্মি করে বসে। রোগীরা আসলে দ্রুত ভর্তি দিয়ে সিজার করানোর তাগাদা দেয়। রোগীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে না। অনেক সময় সিজারের খরচ মেটাতে গিয়ে পথে বসতে হয় দরিদ্র পরিবারগুলোকে। আমরাও (প্রাইভেট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ) গাইনী বিশেষজ্ঞদের কথার বাইরে যেতে পারি না। তাই ব্যাপারগুলো মর্মান্তিক হলেও আমাদেরকে বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয়। তাছাড়া হাসপাতালের ওটি বিল ছাড়া বাকি সব টাকা গাইনী বিশেষজ্ঞরা নিয়ে যায়।

বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সিজার বাণিজ্যে শীর্ষে আছেন ডা. আসাদুজ্জামান, ডা. খাইরুন্নেচ্ছা মুন্নী, ডা. ইফফাত সানিয়া সহ কয়েকজন চিহ্নিত চিকিৎসক। তাদের সিজার ফাঁদে প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হচ্ছে অসংখ্য পরিবার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন