কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ফটোগ্রাফারদের মাঝে শৃঙ্খলা নেই দীর্ঘ ধরে। জেলা প্রশাসন কর্তৃক ফটোগ্রাফারদের জন্য নির্ধারিত আইডি কার্ড থাকলেও এক প্রকার বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে অদক্ষ ফটোগ্রাফারদের কারণে। এছাড়া নিয়ন্ত্রণ নেই কক্সবাজার স্টুডিও মালিক সমিতির। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে অকেজো প্রাচীন সংগঠন কক্সবাজার স্টুডিও মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতি। বলতে গেলে বিলুপ্ত প্রায় সমিতিটি। তাছাড়া জেলা প্রশাসন কর্তৃক দেওয়া কার্ড গুলো নেওয়া হয়েছে নবায়নের জন্য। দীর্ঘ ৭ মাস ধরে নবায়নকৃত কার্ড গুলো না দেওয়ার কারণে ব্যাংকের রিসিভ একাধিক ফটোকপি করে যে যার মতো সৈকতে নেমে পড়ছে ক্যামরা নিয়ে। এমনকি কতিপয় বীচকর্মীদের মাসোহারা দিয়েই একাধিক ফটোকপি নিয়ে সৈকতে ফটোগ্রাফার নামছে বলে প্রচার রয়েছে। তবে আগামী এক মাসের মধ্যে ফটোগ্রাফারদের কার্ড গুলো ডিজিটাল আকারে প্রদান করা হবে বলে জানান জেলা প্রশাসনের নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) মো. মাসুদ রানা।
কক্সবাজার পিপ্লস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন- ছিন্নমূল ও অনভিজ্ঞ কিছু কিশোর স্থানীয় কার্ড মালিকদের মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্র গুলোতে ফটোগ্রাফি করছে। তাদের মধ্যে অনেকেরই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতাও তো নেই বরং আদব-কায়দারও কোনো বালাই নেই। একজন পর্যটকের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে আচরণ করতে হয়, সেটাও তারা জানে না। আবার তাদের মধ্যে অনেকেই ফটোগ্রাফির আড়ালে পর্যটকদের মালামাল চুরির সঙ্গেও জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। অন্যদিকে না বলা সত্ত্বেও একাধিক ছবি তুলে পর্যটকদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করা তাদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃহৎ সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’র সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বলেন- কক্সবাজার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের দেখে ফটোগ্রাফাররা ছুটে আসেন ছবি তুলে দেওয়ার জন্য। পর্যটক না করে দিলেও তাঁরা কিছু ছবি তুলে দেওয়ার জন্য জোর করতে থাকেন। প্রতিটি ছবির বিনিময়ে তাঁরা পাঁচ টাকাকে অনেক সামান্য বলে উপস্থাপন করেন। পর্যটকেরা ভাবেন, পাঁচ টাকাই তো, এ তেমন কিছুই নয়। এভাবেই পা দেন ফটোগ্রাফারদের ফাঁদে। ছবি তোলার সুযোগ পেয়ে একের পর এক ছবি তুলতে থাকেন ফটোগ্রাফার। ছবি তোলা শেষে যখন জানতে চাওয়া হয় ছবির সংখ্যা, সেই সংখ্যা শুনে যেন রীতিমতো চোখ কপালে উঠে যায় পর্যটকদের। আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার ব্যবধানে তাঁরা তুলে ফেলেন ৫০০- ৬০০ ছবি, যার মূল্য দাঁড়ায় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। ফটোগ্রাফাররা সব ছবি নেওয়ার জন্য পর্যটকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। পর্যটকেরা সব ছবি নিতে না চাইলে তাঁরা ধমক দেন। একই ছবি একাধিকবার থাকায় বেছে বেছে ছবি নিতে চাইলে ফটোগ্রাফাররা জুড়ে দেন আরেক শর্ত। বেছে বেছে ছবি নিলে প্রতিটি ছবির বিনিময়ে পরিশোধ করতে হবে দশ টাকা করে। এতে পর্যটক পড়েন আরেক ফাঁদে। ছবি বাছাই করল কি করল না, দু-চারটি ছবি ডিলিট করে তাঁরা তখন দাবি করেন তার থেকে আরও বেশি টাকা। পর্যটক এত টাকা দিতে রাজি না হলে তখন রীতিমতো তাঁদের সঙ্গে পর্যটকদের কথা-কাটাকাটি হয়।
তিনি বলেন- ফটোগ্রাফারের এমন আচরণ প্রায়ই পর্যটকদের আনন্দ নষ্ট করে। তবে ঝামেলা এড়াতে এ ধরনের হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন না পর্যটকেরা। ফটোগ্রাফারের হাতে হয়রানির শিকারের অভিযোগ প্রায়ই এলেও কিছু ঘটনার তাৎক্ষণিক সমাধান হয়, অধিকাংশের কূলকিনারাই পাওয়া যায় না। এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সময় এসব ফটোগ্রাফারদের নিয়ন্ত্রণ করত স্টুডিও মালিকরা। কক্সবাজার স্টুডিও মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতি নামে একটি রেজিস্টার সমিতি রয়েছে। প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে এই সমিতির কার্যক্রম চলে সৈকত এলাকায়। তাদের মাধ্যমে ফটোগ্রাফারদের একটা শৃঙ্খলা তৈরি হয়। ফটোগ্রাফারদের মাধ্যমে কোন পর্যটক হয়রাণির শিকার হলে মালিক সমিতির মাধ্যমে জেলা প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাসহ তা প্রতিরোধ করত সহজে। কিন্তু গত ৫ বছর ধরে অকেজো এই সমিতি। বর্তমানে এই সমিতির কে সভাপতি বা কে আহ্বায়ক খোদ সংগঠনের লোকজনও জানে না। এতে এক প্রকার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে ফটোগ্রাফাররা। তবে ফটোগ্রাফারদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ পেলেই বীচকর্মীদের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন ম্যাজিস্ট্রেট।
সুগন্ধা পয়েন্টস্থ সী-ভিউ কালার ল্যাব ও স্টুডিও ব্যবসায়ী আরজু বড়–য়া বলেন- আমরা অনেকেই আছি পুরাতন স্টুডিও ব্যবসায়ী। তবে আজ অবহেলিত আমরা সবাই। স্টুডিও মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতিতে আমিও ছিলাম। বর্তমানে সমিতিটি প্রায় বিলুপ্ত। তবে সমিতির কার্যক্রম থাকা জরুরি। এতে সকলের সুবিধা হয়।
তিনি বলেন- এখন যদি কোন ফটোগ্রাফার অন্যায় করে তাহলে, তাকে খুঁজতে অনেক সমস্যা হয়। পর্যটকদের সাথে অন্যায় করে ফটোগ্রাফাররা পালিয়ে যায়। আবার তাদের খুঁজতে হন্য হয়ে যায় বীচকর্মী বা ম্যাজিস্ট্রেট। যদি আগের মতো ফটোগ্রাফারদের একটি সংগঠন বা সমিতি থাকতো, তাহলে অন্যায়কারী ফটোগ্রাফারদের সহজেই খুঁজে বের করা যেতো। কারণ হিসেবে তিনি আরও বলেন- কোন ফটোগ্রাফার যদি অপরাধ করে, তাহলে তার কার্ড মালিকদের সমিতির মাধ্যমে আওতায় এনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হতো। একই সাথে সমিতির নিয়ম-কানুন মেনেই পর্যটকদের সেবা দিতো। একই সাথে একটা শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে আসতো সৈকতের ফটোগ্রাফাররা।
কক্সবাজার স্টুডিও মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি কাঞ্জন কুমার আইস বলেন- গতবছরের জুন মাসে প্রায় সাড়ে ৬শত জনের ফটোগ্রাফারের কার্ড নবায়নের জন্য জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখায় জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৭ মাস হয়ে গেলেও এখনো নবায়নকৃত কার্ড গুলো হস্তান্তর করা হয়নি। যার কারণে নবায়নকৃত ব্যাংক রিসিভের ফটোকপি দিয়ে সৈকতে নামছে ফটোগ্রাফাররা। এতে অনেকেই একটা ব্যাংক রিসিভ একাধিক ফটোকপি করেই সৈকতে নামছে। এরমধ্যে খুব সকালে কুটি ছাড়া অনেকেই নামছে সৈকতে। একাধিক ফটোকপি নিয়ে সৈকতে নামার কারণে অনেক ফটোগ্রাফারের কারণে পর্যটকরা কৌশলে হয়রাণির শিকার হচ্ছে। এতে আসল ফটোগ্রাফার কারা বুঝতে অসুবিধা হয় সবার। যার কারণে এক প্রকার বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে ফটোগ্রাফারদের মধ্যে।
তিনি বলেন- যদি কালার ল্যাব বা কার্ড মালিকদের সমিতি সক্রিয় থাকতো তাহলে, হুট করে কেউ এসে সৈকতে ফটোগ্রাফির কাজে নামতে পারতো না। আর একাধিক ফটোকপি নিয়ে যে কেউ সৈকতে নামতে সাহজ পেতো না। এক প্রকার শৃঙ্খলা থাকতো ফটোগ্রাফার ও কার্ড মালিকদের। সমিতির মাধ্যমে সহজেই অপরাধী ফটোগ্রাফারদের আইনের আওতায় আনতে পারতো জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ।
এবিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) মো. মাসুদ রানা বলেন- ফটোগ্রাফারদের প্রতারণা এড়াতে কার্ড মালিক ও পেশাদার ফটোগ্রাফারদের ডেটাবেইসের আওতায় আনা হচ্ছে। আগামী এক মাসের মধ্যেই নবায়নকৃত ডিজিটাল কার্ড প্রদান করা হবে।
তিনি বলেন- সৈকতে কোনো পর্যটক হয়রানির শিকার হলে কর্তৃপক্ষের কাছে তৎক্ষণাৎ অভিযোগ করতে হবে। কেননা অভিযোগ না করে এড়িয়ে গেলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। বরং আরও বৃদ্ধি পাবে। ইতিমধ্যে অভিযোগ পেয়ে অনেক ফটোগ্রাফারদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। একই সাথে ক্যামরাও জব্দ করা হয়েছে।