কখনো পুলিশের সোর্স আবার কখনো র্যাবের সোর্স পরিচয়ে কক্সবাজার শহরের কলাতলী, হোটেল মোটেল জোন, কটেজ জোন এবং লাইট হাউজ এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সেলিম নামে একব্যক্তি। কয়েকজন পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের সাথে কৌশলে সখ্যতা গড়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও মানুষকে একের পর এক হয়রাণি করে যাচ্ছেন তিনি। নিজের কোন ব্যবসা বা চাকরি না থাকলেও নিয়মিত লাইট হাউজস্থ কটেজ জোনের একটি দোকানে অবস্থান করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সোর্স পরিচয় দিয়ে আদায় করছে অর্থও। প্রশাসনকে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ইতিমধ্যে অনেকের কাছ থেকে টাকা আদায় করার তথ্যও পাওয়া গেছে সেলিমের বিরুদ্ধে। এমনকি কতিপয় পুলিশ সদস্যদের সাথে অভিযানের নামে বিভিন্ন হোটেলে যাওয়ার ভিডিও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সোর্স পরিচয় দিয়ে দাপিয়ে বেড়ানো সেলিমের অপকর্ম পাহাড় সমান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- শহরের লাইট হাউজ এলাকার বাসিন্দা সেলিম সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অবস্থান করেন কটেজ জোনের ইমরানের পানের দোকানে। ওই দোকানে অবস্থান করে মাদক কারবারি, দালাল, কটেজ ও বিভিন্ন দোকান থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করে। নিয়মিত টাকা আদায় করতে না পারলেই পুলিশ ও র্যাবের হুমকি দেন। এমনকি তার সাথে কয়েকজন পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা প্রায় সময় কটেজ জোনে দেখা করে অলিগলিতে চলাফেরার জনশ্রুতি রয়েছে। এতে তিনি নিজেকে র্যাব ও পুলিশের সোর্স পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে নিয়মিত অর্থও।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে- গত এক মাস আগে ওয়াহিদ সওদাগর নামে একব্যক্তিকে মারধর করেন সেলিম। ওয়াহিদের কাছ থেকে দাবীকৃত টাকা না পাওয়ায় তাকে মারধর করে পুলিশের হাতের তুলে দেওয়ার হুমকি দেন। কটেজ ও হোটেল মোটেল জোনে খুচরা মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত জসিম, রাকিব ও নাছির। পুলিশের ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে সেলিমের বিরুদ্ধে। আটকের ভয়ে এসব মাদক কারবারিরাও নিয়মিত টাকা দেন সেলিমকে। এমনকি কটেজ জোনে রহিমের ভাতের দোকান থেকে কয়েকদিন পর পরেই টাকা নেন সেলিম। টাকা না দিলে পুলিশের হুমকিও দেন তিনি। হুমাইরা, জান্নাত ও রোকসানাসহ বহু মহিলা থেকে হুমকি দিয়ে টাকা আদায়ের তথ্য রয়েছে সেলিমের বিরুদ্ধে।
একটি সূত্রে জানা যায়- গত তিন মাস আগে রাতে রমজান ও আবছারকে শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মহিউলের হাতে আটক করান সেলিম। আটকের পর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় সমুদ্রসৈকতের সী-গাল পয়েন্টে। তাদের কৌশলে আটকের পর তদবির করেন সেলিম নিজেই। তাদের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়ে পুলিশের কাছ থেকে রাতেই ছেড়ে নেন সেলিম। এরপর থেকে শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের নাম ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি কটেজ থেকে মাসিক মোটা অংকের টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে সেলিমের বিরুদ্ধে। প্রতিমাসে নির্দিষ্ট কটেজ থেকে ফোন করে টাকা আদায় করে যাচ্ছে সেলিম। টাকা না দিলে পুলিশ দিয়ে অভিযান করার হুমকিও দেন বহুবার।
এমনকি শহর পুলিশ ফাঁড়ির নামের ৪ থেকে ৫টি কটেজ থেকে মাসে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা নেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে সেলিমের বিরুদ্ধে। এছাড়া এসব কটেজ থেকে সপ্তাহে ১ হাজার টাকা করে বিভিন্ন কৌশলে আদায় করে সেলিম। লাইট হাউজ এলাকায় বউ নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন নোয়াখালীর সাগর। তারা কাজ করেন হোটেলে। তাদের কাছ থেকেও টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন সেলিম। টাকা না দিলে চাকরি করতে না দেওয়ার হুমকি দেন সেলিম। গত একমাস আগে ডিবি পুলিশ কটেজ জোনে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন দালালকে আটক করেন। আটক দালালদের মধ্যে একজন ফাহিম। যিনি সেলিমের ছেলে জানা গেছে। ফাহিমকে ছাড়িয়ে নিতে ডিবি অফিসেও যান তিনি।
লাইট হাউজ এলাকার এক দোকানদার বলেন- সেলিমের হয়রাণি থেকে কেউ রেহায় পাচ্ছে না। অপরাধীসহ সাধারণ ব্যবসায়ীদের নিয়মিত র্যাব ও পুলিশের ভয় দেখান। ভয় দেখিয়ে অনেক মাদক কারবারি ও দালাল থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করেন। একই সাথে সাধারণ ব্যবসায়ীদের হুমকির ফাঁদে পেলেন তিনি। তার অত্যাচারে অনেক সাধারণ ব্যবসায়ী আতঙ্কে রয়েছে। তিনি প্রায় সময় শহর পুলিশ ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্যের সাথে কটেজ জোনে বিচরণ করেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে যাচ্ছে।
কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান- অপরাধীদের পুলিশ বা র্যাব আটক করলে ভালো কথা। তাদের কেউ না কেউ তথ্য দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হোক এটা সবাই চাই। অপরাধ মুক্তহোক এটা সবার কামনা। কিন্তু বিভিন্ন মাদক কারবারি, দালাল ও পতিতাদের পুলিশ ও র্যাবের হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করছে সেলিম। এতে অপরাধীরা যেমন রক্ষা পাচ্ছে, তেমনি পুলিশ ও র্যাবের মান-সম্মান ক্ষুন্ন হচ্ছে। সেলিমের এসব অপকর্ম প্রতিটি ব্যবসায়ীর মুখে মুখে। অনেক নিরহ মানুষকে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করেছে বহুবার।
এবিষয়ে লাইট হাউজ এলাকার সেলিম সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন- আমি র্যাব বা কোন পুলিশের সোর্স নই। কারো নাম ব্যবহার করে টাকাও আদায় করি না।
কক্সবাজার শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মহিউল ইসলাম বলেন- কটেজ জোন এলাকার সেই সেলিমকে আমি চিনি। তার কটেজ আছে শুনলাম। তবে আমার নাম বা পুলিশ ফাঁড়ির নাম ব্যবহার করে টাকা আদায়সহ মানুষজনকে ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়টি আমি অবগত নই। যদি কোন ভুক্তভোগি অভিযোগ করে বা অবগত করে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি তদন্ত নাজমুল হুদা বলেন, পুলিশের নাম ব্যবহার করে এবং সোর্স পরিচয় দেয় এমন কারো বিষয়ে অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিবো। যেসব অপরাধীরা এমন কাজ করছে তাদের বিষয়ে তদন্ত করা হবে।