• মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
চকরিয়ায় ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যা : ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিলেন ‘কালু ড্রাইভার’ কর্মস্থল কক্সবাজার : প্রজেক্ট ম্যানেজার পদে নিয়োগ দেবে সেভ দ্য চিলড্রেন কক্সবাজারসহ ৫ জেলায় ভারি বৃষ্টি ও ভূমিধসের আশঙ্কা ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যাকান্ডে দুই নারীসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা সাগরে ভাসতে থাকা ১৩ জেলেকে উদ্ধার করল কোস্টগার্ড চকরিয়া ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যা : হুমকির অডিও ঘিরে চাঞ্চল্য কক্সবাজারকে সাজালে বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতি কক্সবাজার ভ্রমণে যাওয়ার পথে সীতাকুন্ডে দুর্ঘটনায় একজন নিহত আসছে টানা ৭ দিন ছুটির সুযোগ জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানের বায়োতে যা লেখা হয়েছে

অপরূপ রেমাক্রি-নাফাখুম জলপ্রপাতে ছুটছে পর্যটক

নিজস্ব প্রতিদেক / ২৫৪ বার ভিউ
আপডেট সময় : সোমবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২১
দু’পাশে পাহাড় মাঝখানে নদী হয়ে থানচি থেকে রেমাক্রি যাচ্ছে পর্যটক।

ভয়েস ওয়ার্ল্ড ডেস্ক:
দেশের সবচেয়ে বড় ও দৃষ্টিনন্দন জলপ্রপাত বা প্রাকৃতিক ঝরনা কোনটি? উত্তরে অল্পসংখ্যক মানুষই বলবেন ‘নাফাখুম’ বা ‘রেমাক্রি’। বেশির ভাগ মানুষের বলতে না পারার কারণ হচ্ছে, জায়গাটা অপরিচিত ও দুর্গম এলাকা।

এখন দুর্গম পথের সেই রেমাক্রি-নাফাখুমও টানছে বিপুল পর্যটক। ঝরনা দুটির অবস্থান কক্সবাজার শহর থেকে ১৬৬ কিলোমিটার ও বান্দরবান সদর থেকে ১১৮ কিলোমিটার দূরে থানচি উপজেলার রেমাক্রি ইউনিয়নে। যাতায়াতের প্রধান ও অন্যতম পথ হচ্ছে পাহাড় থেকে নেমে আসা সাঙ্গু নদ। সকাল ছয়টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত সাঙ্গু নদে চলাচল করে পর্যটকবাহী চার শতাধিক ইঞ্জিনচালিত নৌকা।

প্রতিটি নৌকার ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চ পাঁচজন। আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে ভাড়া গুনতে হয় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। জীবনে যাঁদের সাঙ্গু নদ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে, তাঁরাই বলতে পারবেন—এত রূপ লাবণ্য প্রকৃতির সমাহার অন্য কোথাও আছে কি না।

থানচি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান থোয়াই হ্লা মং মারমা বলেন, আগে মানুষ থানচিকে দুর্গম ও অনিরাপদ এলাকা ভাবত, তখন যোগাযোগব্যবস্থাও খারাপ ছিল। এখন অনেক উন্নতি হয়েছে, নিরাপত্তাও আছে। তাই প্রকৃতির টানে ছুটছেন মানুষ।

রেমাক্রি পর্যটন স্পটে আনন্দ।

স্থানীয় লোকজন বললেন, পর্যটকদের মূল আকর্ষণ রেমাক্রি ও নাফাখুম ঝরনা। গত বছর দৈনিক সর্বোচ্চ ৫০০ জন পর্যটক সাঙ্গু নদ ভ্রমণ করেন। এখন দৈনিক আড়াই হাজার। ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে অন্তত পাঁচ হাজার পর্যটক থানচিতে আসেন। এর মধ্যে আড়াই হাজার গেছেন রেমাক্রি-নাফাখুম জলপ্রপাত ভ্রমণে।

সাঙ্গুকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এখানকার (থানচি) মানুষের যোগাযোগ, দৈনন্দিন কাজকর্ম ও জীবন–জীবিকা। নিরাপত্তা দিচ্ছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি, পুলিশ।

মিয়ানমার সীমান্তর্তী ‘মদক’ পাহাড় থেকে সৃষ্ট সাঙ্গু নদ সাপের মতো আঁকাবাঁকা পথে নেমে গেছে থানচি-লামা-বান্দরবান হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বাঁশখালীর ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে। উৎসস্থলে এ নদের দৈর্ঘ্য ২৯৪ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১১৯ মিটার। উৎসস্থল থেকে সাঙ্গুর অন্তত ৭০ কিলোমিটার পড়েছে থানচিতে। শীতকালে নদের পানি অনেকখানি শুকিয়ে যায়। এ কারণে থানচি নদের প্রস্থ কোথাও ৫০, কোথাও ১২০ মিটারে ঠেকে।

সীতার পাহাড় কতদূর…
১৫ ডিসেম্বর সকাল ছয়টা। সীতার পাহাড় দেখবো বলে আমরা কয়েকজন গেলাম থানচি বাজারের বিজিবি ঘাটে। ঘাটের নিচে সাঙ্গু নদ ও থানচি সেতু। নদের পাড়ে সারিবদ্ধ ৫০টির বেশি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের রেমাক্রি বাজার পর্যন্ত আসা-যাওয়ার (রিজার্ভ) বিপরীতে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় ভাড়া হলো একটি নৌকা।

নদের উজান পানিতে ছুটছে নৌকাটি। স্বচ্ছ জল, কয়েক ফুট নিচের পাথরের স্তূপ দেখা যায়। পানির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় পাথরখণ্ড। পাথরের ওপর ও পাশ দিয়ে নৌকা চলে হেলেদুলে, ইঞ্জিনের ‘বটবট’ শব্দে। ইঞ্জিনের বিকট শব্দে চিৎকার করে দুই পাশের উঁচু পাহাড়সারিতে থাকা পশুপাখি। প্রকৃতির জয়গান, সবুজের নান্দনিক এমন দৃশ্য মুহূর্তেই মনকে সতেজ করে তোলে। নদের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় পাথরখণ্ডের পাশ ঘেঁষেই চালাতে হয় নৌকা। নৌকার মাঝি নুরুল ইসলাম (৪৫) মাঝেমধ্যে বলে ওঠেন, ও ভাই এপাশ হোন। কিছুক্ষণ পর বলেন, এপাশে আসুন, সামনে বড় পাথর।’

নৌকা চলছে থেমে থেমে, পানির নিচে পাথর পড়লে ইঞ্জিন বন্ধ হয়, ঠেলতে হয় নৌকা। পানির গভীরতা বেশি হলে চলে দ্রুতগতিতে। এভাবে এক ঘণ্টায় পার নদের ১৩ কিলোমিটার, সামনে তিন্দুবাজার। থানচির চারটি ইউনিয়নের একটি তিন্দু। এখানে মারমা, ম্রো, বম, খেয়াং, কুমি, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বসবাস চোখে পড়ল। তাঁদের অতিসাধারণ জীবন। কেউ নদের পানিতে জাল ফেলে মাছ ধরছেন, কেউ নদের তীরে বা পাহাড়ের ঢালুতে ফসল ফলাচ্ছেন। কেউ করছেন ফলমূলের ব্যবসা। নদের বুকে চলাচলকারী কিছু নৌকায় ফেরি হচ্ছিল বিপুল কলা, জুমের ফসল। আর বানের পানিতে ভাসিয়ে বাজারে নেওয়া হচ্ছে বিপুল কাঠ-বাঁশ।

তিন্দুবাজারের পাশে চিংড়ি ঝরনা। যাতায়াত ঝুঁকিতে পা বাড়ানো হয় না এ ঝরনায়। দুই কিলোমিটার যেতেই সামনে পড়ে আকাশছোঁয়া বিশাল এক পাথর। পাহাড়িদের ভাষায় এটি ‘রাজাপাথর’। নদের বুকে যতগুলো পাথর দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় এটি। রাজাপাথরে প্রতিদিন পূজা–অর্চনা সারেন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার লোকেরা।
রাজাপাথরে একটু দূরে কুমারী ঝরনা। বর্ষায় নাকি এ ঝরনার অন্য রূপ দেখতে পাওয়া যায়। রাজাপাথর ও কুমারী ঝরনার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আকাশছোঁয়া আরেকটি পাহাড়। পাহাড়টি জমাটবাঁধা পাথরের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নাম ‘সীতার পাহাড়’। পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে কয়েকবার তাকানো হলো, মাথা দেখা যায় না। সীতার পাহাড়ের উচ্চতা কত?

অপরূপ রেমাক্রি-নাফাখুম
সীতার পাহাড় থেকে আরও ১৫ কিলোমিটার গেলে রেমাক্রি বাজার। থানচি থেকে রেমাক্রি বাজারের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার, ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা। বাজারের দক্ষিণ পাশে রেমাক্রি জলপ্রপাত।

রেমাক্রির ঝরনার ঠান্ডা জলে গা ভাসাচ্ছেন অর্ধশতাধিক পর্যটক, তাঁরা তুলছেন ছবি। কিন্তু স্মৃতির এই ছবি-ভিডিও ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে আপলোড করতে না পারায় হতাশ সবাই। কারণ, থানচিতে মুঠোফোন নেটওয়ার্ক পাওয়া খুবই কষ্টকর।

নাফাখুম পর্যটকের দল।

রেমাক্রি ঝরনার পাশ দিয়েই পায়ে হেঁটে যেতে হয় নাফাখুম জলপ্রপাতে। সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। নাফাখুম জলপ্রপাতকে দেশের ‘নায়াগ্রা’ বলা হয়।

পানিপ্রবাহের দিক থেকে এটি অন্যতম বড় জলপ্রপাত। মারমা ভাষায় ‘খুম’ অর্থ জলপ্রপাত। নাফাখুমে পানি আঁকাবাঁকা পথে রেমাক্রিতে এসে সাঙ্গু নদে মিশেছে।
নাফাখুম দেখতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন গাজীপুর উশান সোয়েটার ফ্যাক্টরি থেকে আসা ৭৫ জনের একটি দল। তাঁদের একজন সোহেল আহমদ (৩৪) বলেন, নাফাখুম বাংলাদেশের নায়াগ্রা, স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু নাফাখুমে যেতে দম (সাহস বা শক্তি) লাগে।

আমাদের গাইড মো. রাশেদুল ইসলামের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতিতে। টানা ১৪ বছর ধরে তিনি রেমাক্রি-নাফাখুমে পর্যটক টানছেন। রাশেদুল বলেন, রেমাক্রির উপরের দিকে (উৎসস্থলে) সাঙ্গু নদ আছে আরও ৩০-৪০ কিলোমিটার। সেদিকে গেলে দেখা মেলে ছোট মধুবাজার, বড় মধুবাজার, আঁধারমানিক বাজার, নারিচ্যবাজার, লিক্রিবাজার, সর্বশেষ পানঝিরি বাজার। কিন্তু সেদিকে পর্যটকের যাতায়াত সংরক্ষিত।

কয়েকজন গাইড বলেন, সাঙ্গু নদে পর্যটকবাহী নৌকা চলে ৪৮০টির বেশি। বৃহস্পতি ও শুক্রবার গড়ে ৭০০ জন রেমাক্রি ঝরনা দেখতে আসেন। নাফাখুম দেখতে যান দুই শতাধিক। কারণ, রেমাক্রি থেকে নাফাখুমে যেতে হয় পায়ে হেঁটে, সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। নারী, শিশু ও বয়স্ক লোকজনের পক্ষে দুর্গম পাহাড়-ঝিরির পিচ্ছিল পথ মাড়ানো কঠিন। হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এ পথ নিষিদ্ধ।

নাফাখুম অদিবাসীদের বাড়িতে থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা।

মিয়ানমার সীমান্তের কাছে ‘নাক্ষিয়ং’ পাহাড়ে আরেক জলপ্রপাত আমিয়াখুম। দেশের সুন্দর জলপ্রপাত। আমিয়াখুমে যেতে সময় লাগে পাঁচ ঘণ্টার বেশি। এক্ষেত্রে নাফাখুমের কাছে সাজিপাড়ায় রাত যাপন করতে হয়। গাইড নিয়ে যেতে হয় সেখানে।
আমিয়াখুমের কাছে দেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কেওক্রাডং, তাজিংডং। ইচ্ছে করলে সর্বোচ্চ শৃঙ্গেও উঠতে পারেন, তবে প্রস্তুতি লাগবে। সেখানে বিজিবি ক্যাম্প আছে।

থানচি থেকে রেমাক্রি-নাফাখুম যেতে পথে পথে আনন্দ-রোমাঞ্চের যে অভিজ্ঞতা, ফিরতে পথে তা আর থাকে না। তখন মাথায় ভর করে ফিরে আসার তাড়না। তবে, পাহাড়-ঝরনার থানচিতে দেখার আছে অনেক কিছু। সূত্র-প্রথম আলো।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন