বিশেষ প্রতিবেদক
কক্সবাজার শহরের দরিয়ানগর বড়ছড়া থেকে মামলাবাজ, ভূমিদস্যু, উগ্রবাদী ও মিথ্যা গুজব সৃষ্টিকারী রাজারবাগপীরের আস্থানা উচ্ছেদ করে মসজিদ ও স্কুল জবরদখল মুক্ত করার দাবীতে মানববন্ধন করেছে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
রোববার (২৪ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজার পৌরসভা চত্বরে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বড়ছড়ায় স্কুল, মসজিদ, নিরীহ মানুষের জমি ও খাল দখল করে নিয়েছে রাজারবাগপীরের চক্র। খালের গতিপথ পরির্তন করে স্থাপনা নির্মাণ করায় ভয়াবহ পাহাড় ধসের সৃষ্টি হয়েছে। তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অপকর্মের কেউ প্রতিবাদ করতে চাইলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিচ্ছে। ধর্মের লেবাসধারী রাজারবাগপীরের আস্থানা দ্রুত উচ্ছেদ না করলে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেন স্থানীয়রা।
পরিবারের করুণ অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে মানববন্ধনে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভুক্তভোগী আমির হোসেনের মেয়ে। বাবাকে মিথ্যা মানবপাচার মামলায় কারাগারে নিয়ে যাওয়ার পর আর পড়াশোনা করা হয়নি তার।
তিনি বলেন, মামলার ঘানি টানতে গিয়ে তাদের পরিবার শেষ হয়ে গেছে। এখন মুখ খোলায় পীরের লোকজন মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।
আয়োজকরা জানান, দরিয়ানগরবাসী গত এক যুগের বেশি সময় ধরে ‘ধর্মকে বিকৃতকারী, উগ্রবাদী, মামলাবাজ, ভূমিদস্যু, সমাজে গুজব তৈরির মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী, ধর্মীয় অনুভূমিতে আঘাত দানকারী রাজারবাগী পীরের অক্ষর জ্ঞানহীন মুরীদদের হাতে জিম্মি কক্সবাজার শহরতলীর দরিয়ানগর বড়ছড়াবাসী।
৯০ এর দশকে এই গ্রামে কয়েকশত পরিবারকে পূনবার্সন এবং একটি আশ্রয়ণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পর এখানে বসতি শুরু হয়। পরবর্তীতে এখানে মসজিদ মক্তব, স্কুল, বনবিভাগের পিকনিক স্পট, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র ও অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে এই গ্রামে স্থায়ী ও অস্থায়ী অধিবাসী মিলে প্রায় ৩ হাজার মানুষ বসবাস করে। এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষই অশিক্ষিত ও জেলে-দিনমজুর-শ্রমিক শ্রেণির মানুষ। তবে জেলা সদরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ উচ্চশিক্ষিত লোকজনও এই গ্রামে বাস করে। তবে এখানে শিক্ষিত লোকজনের মুখ খোলার সুযোগ নেই। কারণ ২০০৭ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের পীরের’ তকমা লাগিয়ে রাজারবাগী মোল্লারা এখানকার ঐতিহ্যবাহী ‘ঝাউবন প্রাথমিক বিদ্যা নিকেতন’ স্কুল এক একর জমিসহ দখল করে ‘মাদ্রাসার’ নামে আস্তানা গড়ে তুলে। তবে এখানে স্থানীয় কোন শিশুকে ভর্তি করানো হয় না। বর্তমানে এখানে মাত্র ৬ জন কথিত শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা অন্য এলাকার ছেলে।
এলাকাবাসী জানান, রাজারবাগীরা দরিয়ানগরে আস্তানা গাড়ার পর এক একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত গ্রামের জামে মসজিদটিও দখল করে নিজেদের নামে নামকরণ করে। এছাড়া সম্প্রতি দরিয়ানগর বড়ছড়া খালের গতিপথ পরিবর্তন করে তারা প্রায় কোটি টাকার সরকারি ভূমি জবর দখল করে রাখে।
স্থানীয় বাসিন্দাও জেলা আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য আল্লামা আতিকুল ইসলাম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক জানান, রাজারবাগীরা এই গ্রামের স্কুল ও মসজিদ দখল করে নেওয়ার পর থেকে এই গ্রামের শিক্ষিত সমাজ তাদের মূল্য হারিয়েছে এবং কথা বলার অধিকার হারিয়েছে। রাজারবাগী মোল্লারা যাই বলে পীরের মুরীদরা তাই করে।
জবর দখল করে রাখা গ্রামের মসজিদে তারা প্রতিদিনই কোরআন সুন্নাহ বিরোধী, মনগড়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করে গ্রামবাসীর মাঝে হিংসার বীজ পুঁতে দিচ্ছে। যে কারণে গ্রামবাসী একতাবদ্ধ হয়ে সমাজে কোন ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
রাজারবাগীরা ছাড়া অন্যদেরকে মসজিদে নামাজ পড়তে দেয়া হয় না। ফলে এলাকার অধিকাংশ মুসল্লী তাদের বিরোধী হওয়ায় গ্রামের বাইরের মসজিদে অথবা ঘরে নামাজ পড়তে বাধ্য হয়। রাজারবাগীরা তাদের বেতনধারী সন্ত্রাসী প্রকৃতির কিছু মুরীদ দিয়ে পুরো গ্রামবাসীকে জিম্মি করে রেখেছে। রাজারবাগী মোল্লা সিলেটের বাসিন্দা ফারুক নেপথ্যে এই গ্রামকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
রাজারবাগী মোল্লা ব্যতীত কাউকে দিয়ে এখানে ওয়াজ মাহফিল, বিয়ে পড়ানো, দাওয়াত কিংবা জানাযা পড়ানো যায় না। ওরা বলে- রাজারবাগের পীর দিল্লুর রহমান (লা.আ) একজন আওলাদে রাসুল, তিনি এ যুগের শ্রেষ্ঠ মোজাদ্দিদ, গউসুল আযম; তাকে মানতেই হবে।
স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম বলেন, আমরা রাজারবাগী পীরের মুরীদদের বাধায় এলাকায় ব্যানার-ফেস্টুন লাগাতে পারিনা, সমাবেশ করলেও লোকজনকে সেখানে যেতে বাধা দেয়া হয়। তারা ‘ছবি তোলা হারাম’ দাবি করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবিতে পর্যন্ত মল নিক্ষেপ করেছে। উগ্রবাদ প্রচারকারী এই গোষ্ঠী দেশের সা¤প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্যও ভয়ংকর হুমকী।
স্থানীয় যুবলীগ নেতা মোশাররফ হোসেন পারভেজ বলেন, সারা দেশব্যাপী রাজারবাগী পীর ও মুরীদদের বহুমুখী অপরাধমূলক কর্মকান্ডের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল, অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল, ডিআইজি পিবিআই, পুলিশের সন্ত্রাস দমন বিভাগ ও দুদকসহ সরকারের ৯ দপ্তরের প্রধানকে নির্দেশনা দিয়েছেন উচ্চ আদালত। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে রিট পিটিশন নং ৭৯০২/২১ এর প্রেক্ষিতে বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম ও মো. মোস্তাফিজুর রহমান এর বেঞ্চ গত ১৯ সেপ্টেম্বর এ আদেশ দেন। এছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের করণীয় নির্ধারণ সংক্রান্ত কমিটি এই পীরচক্রের মানবাধিকার লঙ্ঘন থামাতে ৭টি সুপারিশ করেছে।
দরিয়ানগর বড়ছড়াসহ কক্সবাজারের নিরীহ মানুষের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি রাজারবাগপীরের সকল আস্তানা উচ্ছেদে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।