বিশেষ প্রতিনিধি:
বিয়ে করে স্ত্রীকে রেখে সংসারের চাকা সচল করতে হেলাল উদ্দিন পাড়ি দেন মালয়েশিয়া। কিন্তু তাকে প্রবাসে বেশিদিন কষ্ট করতে হয়নি। বিয়ের কিছুদিনের ব্যবধানে স্ত্রী শুরু করেন ইয়াবা কারবার। ধীরে ধীরে স্ত্রীর ব্যবসা বড় হওয়ায় হাল ধরতে সূদুর প্রবাস ছেড়ে চলে আসেন স্বামী। এখন স্বামী-স্ত্রী মিলে গড়ে তুলেছেন ইয়াবার বিশাল সিন্ডিকেট।
ভয়েসওয়ার্ল্ডের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে স্বামী-স্ত্রী সিন্ডিকেটের আদ্যোপান্ত। হেলাল উদ্দিনের বাড়ি উখিয়ার মাইজপাড়া এলাকায়। তিনি বিয়ে করেছেন কক্সবাজার শহরের টেকপাড়ার হাঙরপাড়ার মো. নুরুর মেয়ে কাসপিয়াকে।
শুধু কাসপিয়ার স্বামী হেলাল উদ্দিন নয়, কাসপিয়ার বড় বোন শেফা আক্তারের স্বামী ইউসুফ ওরফে মামুনও প্রায় ১০ মাস পূর্বে মালয়েশিয়া থেকে ইয়াবা সিন্ডিকেটের হাল ধরতে দেশে ফিরে আসেন। ইয়াবা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রবাস থেকে ফেরার পর থেকেই হেলাল উদ্দিন ও মামুন টেকপাড়া হাঙরপাড়ার শশুরবাড়িতে থাকতেন। উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবির থেকে চালান এনে কক্সবাজার শহর ও দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করে এই সিন্ডিকেট।
র্যাব সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ মে হাঙরপাড়ায় ইয়াবা ক্রয়-বিক্রয়ের খবর পেয়ে মো. নুরুর বাড়িতে অভিযান চালায় র্যাব-১৫। এসময় ইউসুফ ওরফে মামুনকে (৩৭) গ্রেপ্তার করে। উদ্ধার করা হয় ৩৬ হাজার পিস ইয়াবা।

কিন্তু প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র্যাবকে বেশকিছু ভুল তথ্য দেন ইয়াবাসহ আটক মামুন। তিনি র্যাবের কাছে দাবী করেন মো. নুরুর বাড়ির ভাড়াটিয়া তিনি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মামুন নুরুর মেয়ের জামাই। ওই বাড়িতে বসবাস করে ইয়াবা ব্যবসা চালাতেন।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই ৩৬ হাজার পিস ইয়াবার চালান উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবির থেকে কক্সবাজার শহরের টেকপাড়ার বাসায় নিয়ে আসেন কাসপিয়া ও তার স্বামী হেলাল উদ্দিন। পরে সেই চালান অন্য ইয়াবা কারবারির কাছে হস্তান্তরের জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন মামুন। কিন্তু বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই র্যাব ইয়াবাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে মামুনকে।
এই সিন্ডিকেটের প্রধান হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী কাসপিয়া। স্বামী বিদেশ থাকা অবস্থায় ইয়াবা কারবার গড়ে তুলেন কাসপিয়া। উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরের কয়েকজন নারী ইয়াবা পাচারকারীর মাধ্যমে নিজের ইয়াবা ব্যবসা শুরু করেন। তাদের মাধ্যমে উখিয়া থেকে ইয়াবা নিয়ে যান কক্সবাজার শহরে। সেখান থেকে কাসপিয়া বিভিন্ন স্থানে পাচার করেন। এছাড়াও উখিয়া থেকে ইয়াবার চালান নিয়ে নিয়মিত কক্সবাজার আসা-যাওয়া করতেন কাসপিয়া নিজে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ইউসুফ ওরফে মামুন সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নের মনুপাড়ার হাজী জহির আহমেদের ছেলে। মামুন কয়েক বছর আগে শ্রমিকের কাজ করতে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে শ্যালিকা কাসপিয়ার প্রলোভনে পড়ে প্রায় ১০ মাস পূর্বে প্রবাস ছেড়ে দেশে চলে আসেন। শ্যালিকার সাথে শুরু করেন ইয়াবা ব্যবসা। সিন্ডিকেটে যোগ দেন মামুনের স্ত্রী শেফা আক্তারও। গড়ে তুলেন রমরমা ইয়াবা কারবার।
মামুনের সম্পর্কে খোঁজ নিতে খুরুশকুল মনুপাড়ায় যান ভয়েসওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদক। মামুনের বড় ভাই এবং কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, টানা কয়েকবছর বিদেশ থাকার ২০১৯ সালের শেষের দিকে হঠাৎ কিছু না জানিয়ে দেশে ফিরে আসেন। দেশে এসেই শহরের টেকপাড়ায় শশুরবাড়িতে চলে যান। বউকে নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন। শহরে মামুন কি করতেন সেই বিষয়ে গ্রামের কাউকে কিছু জানায়নি। এরইমধ্যে গত ১০ মে হঠাৎ খবর আসে মামুন ইয়াবাসহ র্যাবের হাতে আটক হয়েছেন।

এই সিন্ডিকেটে ইয়াবার চালান এনে দিতেন উত্তর তারাবনিয়ারছড়া এলাকার শীর্ষ মাদক সম্রাজ্ঞী মিনুর কাছে। মিনু শহরের সবচেয়ে বড় মাদক স¤্রাজ্ঞী। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফেন্সিডিল ব্যবসা চালিয়ে আসছেন তিনি। বর্তমানে কাসপিয়াদের সাথে সিন্ডিকেট করে ইয়াবা ব্যবসাও চালিয়ে যাচ্ছেন মিনু।
ইউসুফ ওরফে মামুন ইয়াবাসহ র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হলেও কাসপিয়া, তার স্বামী হেলাল উদ্দিন ও মামুনের স্ত্রী শেফা এবং মিনু এখনো অধরা। মামুন গ্রেপ্তার হলেও ইয়াবা ব্যবসা থেমে নেই সিন্ডিকেটের।
জানা গেছে, সিন্ডিকেটের প্রধান কাসপিয়ার স্বামী হেলাল উদ্দিন উখিয়ার মাইজপাড়া এলাকার সাহাব উদ্দিন মাঝির ছেলে। তিনিও বিয়ের পর কয়েক বছর আগে শ্রমিক হিসেবে মালয়েশিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন। পরে স্ত্রীর ইয়াবা ব্যবসার হাল ধরতে চলতি বছরের শুরুর দিকে দেশে ফিরে আসেন। শুরু করেন রমরমা ইয়াবা ব্যবসা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাদের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি দাবী করেন, এই সিন্ডিকেটে সর্বপ্রথম ইয়াবা ব্যবসা শুরু করেন কাসপিয়া। এরপর নিজের বড়বোন শেফাকে সিন্ডিকেটে টানেন। পরে নিজের স্বামী ও বোনের স্বামীকে ইয়াবা ব্যবসার হাল ধরতে দেশে নিয়ে আসেন। সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য মামুন গ্রেপ্তার হলেও তাদের ইয়াবা ব্যবসা এখনো থামেনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, কাসপিয়া সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনতে কঠোর নজরদারি এবং খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানানো হয়।