• রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম
চকরিয়ায় ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যা : ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিলেন ‘কালু ড্রাইভার’ কর্মস্থল কক্সবাজার : প্রজেক্ট ম্যানেজার পদে নিয়োগ দেবে সেভ দ্য চিলড্রেন কক্সবাজারসহ ৫ জেলায় ভারি বৃষ্টি ও ভূমিধসের আশঙ্কা ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যাকান্ডে দুই নারীসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা সাগরে ভাসতে থাকা ১৩ জেলেকে উদ্ধার করল কোস্টগার্ড চকরিয়া ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যা : হুমকির অডিও ঘিরে চাঞ্চল্য কক্সবাজারকে সাজালে বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতি কক্সবাজার ভ্রমণে যাওয়ার পথে সীতাকুন্ডে দুর্ঘটনায় একজন নিহত আসছে টানা ৭ দিন ছুটির সুযোগ জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানের বায়োতে যা লেখা হয়েছে

সবাই তৎপর, তবুও ইয়াবার জোয়ার

নিজস্ব প্রতিদেক / ৫০৬ বার ভিউ
আপডেট সময় : শনিবার, ৫ জুন, ২০২১

আরফাতুল মজিদ

কোনোভাবেই সাগরপথ কিংবা সড়ক পথে ইয়াবার জোয়ার ঠেকানো যাচ্ছে না। মিয়ানমার থেকে সরাসরি এই মাদকের চালান আসছে। মাছ ধরার ট্রলারসহ নৌযানে লুকিয়ে পাচারকারি চক্র ইয়াবার চালান নিয়ে আসছে। শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাত হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ছে উখিয়া-টেকনাফ থেকে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সারা দেশে। মাঝে মধ্যে দুই-একটি চালান ধরা পড়লেও বেশিরভাগ চালান নিরাপদ গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। দেশের সর্বত্রই মিলছে নেশার রাজা ইয়াবা বড়ি।

সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া এসব চালান ধরা অসম্ভব। কারণ গভীর সমুদ্রে চলাচলরত শত শত নৌযানে তল্লাশি করে মাদকদ্রব্য উদ্ধার কোনভাবেই সম্ভব নয়। এ পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে ট্রলার থেকে যতটি চালান ধরা পড়ে তার সবকটির সুস্পষ্ট আগাম তথ্য ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে যে পরিমাণ ইয়াবার চালান উদ্ধার হচ্ছে তার অন্তত দশগুণ নিরাপদে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এলিট বাহিনী র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড, মাদকদ্রব্য অধিদফতরসহ বিভিন্ন অভিযানের এতো তৎপরতার পরেও বন্ধ হচ্ছেনা ইয়াবা পাচার।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালন সোমেন মন্ডল বলেন, গেল মে মাসে কক্সবাজার মাদকদ্রব্য কার্যালয়ে ৩১ টি মামলা হয়েছে ইয়াবা কারবারীদের বিরুদ্ধে। এক লাখের উপরে ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। প্রতিদিন অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রশাসনিকভাবে ইয়াবা বন্ধ সম্ভব নই। সামাজিকভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে মাদক বন্ধের সুফল পাওয়া যাবে।
একসময় সীমান্ত হয়ে সড়ক ও পাহাড়ি পথে ইয়াবার চালান আসতো। এসব পথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জোরদার তৎপরতার কারণে রুট বদল করে পাচারকারিরা। তারা সাগরপথে ইয়াবা পাচারকে নিরাপদ মনে করে। পাচারকারিরা মাছ ধরার অজুহাতে গভীর সমুদ্রে মিয়ানমার সীমান্তে চলে যায়। সেখানে বোঝাই করা হয় ইয়াবার চালান। এরপর উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ঘাটে এনে এসব ইয়াবা খালাস করা হয়। কিছু কিছু চালান নৌপথে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরাসরি চলে যাচ্ছে।

গত মঙ্গলবার (১ জুন) মধ্যরাতে কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা শিবির থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করেছে র‌্যাব-১৫ এর সদস্যরা। এসময় গুরা মিয়া (৪৫) নামে শিবিরের এক সাবেক মাঝিকে আটক করা হয়। আটক শুরা মিয়া বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরের ৯নং ক্যাম্পের জি-ব্লক মৃত নুর আহমদের ছেলে। সে ওই ক্যাম্পের সাবেক হেড মাঝি।

কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ উপ-অধিনায়ক মেজর মেহেদী হাসান বলেন, একটি সংঘবদ্ধ মাদক ব্যবসায়ী চক্র দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান নিয়ে আসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। প্রতিদিন কোন না কোন অভিযানে ইয়াবার ছোট বড় চালান ধরা খাচ্ছে।

গত ৩০ মে র‌্যাব-১৫ এর চৌকষ একটি আভিযানিক দল মাদক বহনের সংবাদ পেয়ে হোয়াইক্যং নয়াপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে প্রধান সড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন তল্লাশী চালায়। এসময় টেকনাফ থেকে কক্সবাজারগামী একটি পিকআপ (ঢাকামেট্টো-ন-১৫-২৮১৯) চেকপোস্টে পৌঁছলে র‌্যাব সদস্যরা তল্লাশী করতে চাইলে পালিয়ে যাওয়ার সময় ধাওয়া করে পিকআপ চালক হ্নীলা ইউনিয়নের দক্ষিণ আলীখালীর মৃত ফরিদ আলমের ছেলে মো. সেলিম (২৪) এবং সহকারী চালক পশ্চিম সিকদার পাড়ার নুর মোহাম্মদের পুত্র মো. মোরশেদ (২৮) পালিয়ে যায়। পরে আটক চালকের স্বীকারোক্তিমতে সীটের নীচে অভিনব কায়দায় ফিটিং অবস্থায় ৭ হাজার ৯শ ৫০পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। তখন পিকআপটি জব্দ করা হয়। র‌্যাবের অভিযানে আগেও চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার-টেকনাফ এলাকায় গভীর সাগরে বেশ কয়েকটি ইয়াবার চালান ধরা পড়ে।

১ জুন কক্সবাজার জেলা পুলিশের সদর মডেল ও টেকনাফ থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে। এরমধ্যে কক্সবাজার শহরের টেকপাড়া থেকে ৪ হাজার ২০০ পিস ইয়াবা ও মাদক বিক্রয়ের নগদ ৪১ হাজার টাকাসহ একজন নারী মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। আটককৃত নারী, কক্সবাজারের দক্ষিন টেকপাড়া (পল্লবী লেইন), ৪নং ওয়ার্ডের জয়নাল আবেদীনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদাউস (৩২)।

সবশেষ বুধবার (২ জুন) পুলিশের অভিযানে টেকনাফ পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড এলাকা থেকে কামাল হোসেনের ছেলে মো: রবিউল ইসলামকে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ আটক করে। প্রতিদিন কক্সবাজারে ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। হয়ত র‌্যাব, না হয় পুলিশ অথবা বিজিবি কিংবা কোস্টগার্ড বা মাদকদ্রব্য অধিদফতর প্রতিদিন ইয়াবা জব্দ করছে। আটকও হচ্ছে পাচারকারি কিংবা ব্যবসায়ীরা। তবুও ইয়াবার জোয়ার বন্ধ হচ্ছে না।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এবছর সর্ববৃহৎ ইয়াবার চালান জব্দ করা হয় কক্সবাজার শহরে। সেই অভিযানে নেতৃত্ব দেন কক্সবাজারের ওসি ডিবি শেখ মো: আলী। ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী চৌফলদন্ডী ব্রীজ থেকে ৭ বস্তা ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় শহরের নুনিয়ারছড়ার ফারুকসহ দুইজনকে। ওই সাত বস্তায় ১৪ লাখ ইয়াবা ছিল। পরে ফারুকের বাসা থেকে আরো সাড়ে তিন লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল । ওই দিন সর্বমোট সাড়ে ১৭ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসব ইয়াবা সাগর পথে আনা হয়েছিল বলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার জানান।

বাংলাদেশকে টার্গেট করে মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট বড় অসংখ্য কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি ইয়াবার চালান ঠেলে দেয়া হচ্ছে এদেশে। শক্তিশালী মাদক পাচারকারি সিন্ডিকেটের হাত হয়ে এসব নেশাদ্রব্য চলে যাচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকায় এখন ইয়াবা মিলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সড়ক পথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সতর্ক নজরদারির কারণে সাগর পথকে নিরাপদ মনে করছে পাচারকারিরা। তাছাড়া সাগরও এখন অন্য সময়ের তুলনায় কিছুটা শান্ত। আর এই সুযোগে সমুদ্রপথেই ইয়াবা পাচার বেড়ে গেছে।

তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, সড়কপথের মতো সাগরপথেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, এলিট বাহিনী র‌্যাব, আধা-সামরিক বাহিনী বিজিবি, পুলিশ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরও সড়ক এবং পাহাড়িপথের পাশাপাশি সাগরপথে ইয়াবার চালান ঠেকাতে নানা কৌশল গ্রহণ করেছে।

কক্সবাজারের এই ইয়াবা ব্যবসা যেসব সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত কেন্দ্রিক মাফিয়া চক্রের যোগাযোগ রয়েছে এবং টেকনাফের গডফাদারদের মাধ্যমে ইয়াবা সংগ্রহ করে তা পৃথিবীর অনেক দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো: হাসানুজ্জামান বলেন, মাদক কারবারিদের তালিকা করা হচ্ছে। এখন নতুন নামও তালিকায় সংযুক্ত করা হচ্ছে। তালিকাভুক্ত অনেকেই কারাগারে আছে। আবার অনেকেই জামিনে বেরিয়ে পুনরায় ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েছে। তাদেরও কাউকে কাউকে ফের গ্রেফতার করা হয়েছে। যারা বড় কারবারি তারা এলাকায় থাকে না। প্রতিদিনই নতুন নতুন মাদক কারবারি তৈরি হচ্ছে, ধরাও পড়ছে। শুধু বিক্রেতা নয়, মাদক কারবারে অর্থ লগ্নিকারী, পৃষ্ঠপোষক, সংরক্ষক, বহনকারী, খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান। ফেব্রুয়ারিতে সবচেয়ে বড় চালান কক্সবাজার জেলা পুলিশ আটক করে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন