• মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৩৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম
কক্সবাজারের পুত্রবধূ হালিমা খাতুন উপসচিব পদে পদোন্নতি টেকনাফে মাদক মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার ৫৩৩ উপজেলা হাসপাতাল ১৫১ শয্যায় উন্নীত করা হবে : প্রধানমন্ত্রী একই জমি দুইবার বিক্রির অভিযোগ : টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রারকে ঘিরে চাঞ্চল্য কক্সবাজার পৌরসভার অর্থায়নে সেগুনবাগিচায় ৪টি রাস্তা নির্মাণ শুরু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিএনপির করণীয় বিষয়ে যা পরামর্শ দিলেন : ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজ উদ্দীন যে ৫ কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিততে পারে আর্জেন্টিনা! টি-টোয়েন্টি সিরিজেও হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের ইয়াবা পরিবহনের দায়ে রোহিঙ্গা তরুণীর কারাদন্ড নিয়োগ দেবে কারিতাস এনজিও : কর্মস্থল কক্সবাজারের উখিয়া

শেষ নিঃশ্বাস

নিজস্ব প্রতিদেক / ৪৯৫ বার ভিউ
আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২০

মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন:

বুধবার রাত ১২টা। সবে মাত্র বিছানায় শুয়েছি। চান্দগাঁও থানার ওসি খোন্দকার আতাউর ভাই কল করলেন। নিশ্চিত কারো এম্বুলেন্স লাগছে। করোনা শুরু হওয়ার পর এই মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা জনগণের সেবার কখনো এম্বুলেন্স, কখনো লক ডাউন করা বাড়ীতে খাবার পৌছাঁতে আলহাজ্ব শামসুল হক ফাউন্ডেশনএর প্রতি একের পর এক দায়িত্ব দিয়ে চলেছেন। কিন্ত এবার অন্য বিষয়।

তিনি বললেন,
-“ভাই একজনের জন্য অক্সিজেন লাগবে। দেয়া যাবে?”
-“বাসায় অক্সিমিটার থাকলে এবং অপারেট করার লোক থাকলে অবশ্যই দেয়া যাবে। কাউকে পাঠিয়ে দিলেই দিয়ে দিবো।”
এই রাতের বেলায় ফাউন্ডেশন অফিস বন্ধ। নিজেকেই অফিস খুলে সিলিন্ডার বের করে দিতে হবে।
একটু পর কল করলো, মামাতো ভাই রাকিব।

ভাইয়া অক্সিজেন কি আছে? ভাবীর নিঃস্বাস নিতে কস্ট লাগছে। আপনি বললে আমি এসে নিয়ে যাবো।
-অক্সিজেন আছে। আগে কিছুক্ষণ নেবুলাইজ করো। যদি বিশেষ প্রয়োজন হয় এসে নিয়ে যেও।

ওসি সাহেব ইতোমধ্যে অপারেট করার জন্য লোক খুঁজে বের করে ফেলেছেন। তবে এই মুহুর্তে ওদের বাসায় অক্সিজেন নিয়ে যাওয়ার মতো কোন গাড়ী বা পুরুষ মানুষ কেউ নেই। তিনি এক ভদ্র মহিলার নাম্বার দিলেন। সেই পরিবারের পিলে চমকানো কাহিনী শোনার পর বুঝতে পারলাম পুরুষ মানুষ থাকবেই বা কিভাবে! ঈদের আগের দিন ভদ্র মহিলার শ্বাশুড়ি মারা গিয়েছেন। তারপর তার স্বামী। অতঃপর তার ভাসুর। এই ক’দিনের মধ্যে একটা পরিবারের ৩ জন মানুষ মারা গেলে ওদের মানসিক অবস্থা কেমন তা কি চিন্তা করা যায়!
এখন ভদ্রমহিলার শ্বশুরের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। একটু অক্সিজেন পেলে আরাম বোধ করতেন। পরামর্শ দিলাম, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্ত তিনি তার স্বামীর চিকিৎসা বিষয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা জানিয়ে সেখানে নিতে ইচ্ছুক নন।

ফাউন্ডেশনের এম্বুলেন্স করে দ্রুত অক্সিজেন পাঠানোর জন্য ড্রাইভারকে কল দিয়ে জানলাম, এম্বুলেন্স এখন লাশ নিয়ে আঁতুরার ডিপো অবস্থান করছে। তাঁকে বললাম, তুমি লাশটা নামিয়ে দিয়েই এম্বুলেন্সে লাগানো নতুন অক্সিজেন বোতলটা রহমান নগর নামিয়ে দাও।

কিছুক্ষণ পরই ড্রাইভার ভদ্রমহিলার শ্বশুরের কাছে অক্সিজেন সেট করে আমাকে আবার কনফার্ম করলো।
চোখটা একটু লেগে এসেছে। ভাগিনা রবিন কল করলো। সময় দেখলাম, ভোর চারটা।
-মামা অক্সিজেন কোথায় পাবো? বড় আব্বুর অবস্থা খুবই খারাপ।
-তুমি অফিসে চলে আসো, ব্যবস্থা করছি।

খানিক পর সে বাসার সামনে হাজির। এই ভোর বেলায় অফিসে গিয়ে বিস্তারিত শুনে রবিনকে জানালাম, এম্বুলেন্সে নতুন অক্সিজেন বোতল সেট করে দিচ্ছি। তুমি এম্বুলেন্স নিয়ে চলে যাও। মনে হচ্ছে রোগীকে অক্সিজেন দেয়ার পরো হাসপাতালে নিতে হবে।

ভোর সাড়ে ৫টায় রবিন জানালো,
-মামা চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে এসেছি। রোগীর অক্সিজেন চলছে। ডাক্তার আইসিইউতে দিতে বলছে। আইসিইউ কোথায় পাবো?
এ বিষয়ে উত্তর আপাতত খুবই করুণ। তারপরো তাকে কয়েকটা হাসপাতালের কথা বললাম, এগুলোতে একটু খুঁজে দেখো। খানিক পরই রবিন জানালো,
-মামা কোথাও আই সি ইউ খালি নেই। অনেক হাসপাতালে কাগজে লিখে দিয়েছে, “আই সি ইউ খালী নেই”।
সকাল ৯টায় রহমান নগরের রোগীর খবর জানতে ভদ্রমহিলাকে কল দিলাম।
তিনি জানালেন,
-আমার শ্বশুর ভোর ৫টায় মারা গিয়েছেন। তিনি বেশ নির্লিপ্ত। অধিক শোক বুঝি একেই বলে!
ওসি সাহেবের সাথে আবার কথা হলো। আতাউর ভাই জানালেন,
-অক্সিজেন দেয়ার পর শ্বশুর ভদ্রলোক বেশ সুস্থ অনুভব করেছিলেন। টয়লেটে গিয়েছেন। তারপর হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়েছেন। জীবনের শেষ ঘুম। নিয়েছেন শেষ নিঃস্বাস।

খানিক পর ভাগিনা রবিনের কল। কান্নাজড়িত স্বর।
-মামা বড় আব্বু মারা গিয়েছেন। চট্টগ্রাম শহরে কোথাও একটা আই সি ইউ খালী পাইনি। ফাউন্ডেশনের এম্বুলেন্স কি খালী আছে? লাশটা যে বাড়ীতে নিতে হবে!
আমি বাকরুদ্ধ। ইতোমধ্যে কয়েকটা অক্সিজেন সিলিন্ডার বেশ কয়েকজন মানবিক মানুষ ফাউন্ডেশনে ডোনেট করেছেন। উনাদের কিংবা উনাদের আত্মীয়-স্বজনের কারো যদি লাগে তবে ফাউন্ডেশনের গাড়ীতে করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেয়া হবে। যতক্ষণ দাতার পরিবারের লাগবেনা ততক্ষণ উপকৃত হতে থাকবে নিঃশ্বাস নিতে কস্ট হওয়া ব্যক্তিগণ। দুয়েকজন ভাই একটা সিলিন্ডারের পুরো টাকা দিতে না পারলেও যতটুকু পেরেছেন শরীক হয়েছেন। ভোরবেলা জাপান থেকে পুরনো বন্ধু কল করে একাউন্ট নাম্বার নিয়ে একটা সিলিন্ডারের টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন।

বিভিন্ন হাসপাতালে পরিচিত অনেকেই ভর্তি হতে না পেরে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। অসহায় পরিবারগুলোর কথা চিন্তা করে বেশ ক’দিন ধরে খুব ইচ্ছে করছে, ইশ! একটা যদি হাসপাতাল করতে পারতাম! কিন্ত এ যে কয়েক কোটি টাকার বিষয়!
জাপান থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার পাঠানো প্রকৌশলী বন্ধু মাহবুল ইলাহী রনি উৎসাহ দিচ্ছেন, ভাই, উদ্যোগ নিয়ে ফেলেন আমরা সবাই মিলে অংশগ্রহণ করবো। তার আন্তরিকতার জন্য অন্তর থেকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীগণ যদি একটু নিজেদের মতামত জানাতেন তবে সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে।

হাসপাতাল নির্মানের বিষয়ে জানাতে পারেন নিজেদের শারীরিক, আর্থিক সহযোগিতার কথা। নিদেন পক্ষে অন্তর থেকে দোয়া। কারো কমিউনিটি সেন্টার বা হাসপাতাল করার উপযোগী বিল্ডিং খালী পড়ে থাকলে তিনি সাদরে এ কঠিন দুর্যোগে একজন স্মরণীয় বীর হিসেবে ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে নাম লিখিয়ে ফেলতে পারেন, এ নিশ্চিত। ভালো কথা, ফাউন্ডেশনের এম্বুলেন্স এবং আপনাদের প্রদত্ত অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলো কিন্ত আগামী দিনের হাসপাতালের জন্য অগ্রীম এসেট!
সকলের মূল্যবান মতামত এবং অপরের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে শেয়ার কাম্য।

সম্মিলিত প্রয়াসে এগিয়ে চলুক মানব সেবা।

লেখক: প্রকৌশলী ও চেয়ারম্যান- আলহাজ্ব শামসুল হক ফাউন্ডেশন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন