ফরিদ মোহাম্মদ:
একদিকে সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই, আরেক দিকে দাদনের নীপিড়ন। ‘দাদনের’ জালে জিম্মি থাকায় সারাবছর মাছ ধরেও কোমর সোজা করতে পারে না জেলেরা। দাদনের ফাঁদে পড়ে মহাজনের পেট ভরাতে গিয়ে ক্লান্ত জেলের সংসার এক সময় অচল হয়ে পড়ে। জালের ফাঁকে মাছ আটকালেও ভাগ্যের ফাঁক দিয়ে সেই মাছ চলে যায় মহাজনের মোকামে।
মৎস্য সম্পদ আহরণে নিয়োজিত জেলেদের হাড্ডিসার দেহ দেখে বিশ্বাস হবে না এরাই প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন নীরবে। ঝড়ঝঞ্ঝা, প্রচণ্ড শীত ও গরমকে উপেক্ষা করে জীবনবাজি রেখে গভীর সমুদ্রে ছুটে যান। তাদের এ শ্রমের ফলে কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন বোট মালিক, দাদনদার আর মহাজনেরা। আর হিসাবের বেলায় খালি হাতে বাড়ি ফেরে জেলেরা।
শহরের জেলেপল্লীখ্যাত কুতুবদিয়াপাড়া, সমিতিপাড়া, ফদনার ডেইল, ফিশারী ঘাট, ৬নং জেটি ঘাট এলাকার একাধিক জেলের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। জেলেরা জানান, বছরে ১০ মাস মাছ ধরার মৌসুম। এই ১০ মাসে ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় চুক্তি হয় বোট মালিক বা মহাজনের সাথে।
সাগরে যাওয়ার আগে চুক্তির তিন ভাগের দুই ভাগ টাকা অগ্রীম দিয়ে দেয়। বাকি টাকা সাগরে যাওয়ার পর কয়েকদফা কিস্তিতে দেয়া হয়। কিন্তু জেলেদের নিজের বা পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতার কারণে সাগরে যেতে না পারলে দাদন (অগ্রিম নেওয়া টাকা) থেকে দৈনিক কেটে নেয়া হয় ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা।
জেলেদের অসুস্থতা বা সুবিধা অসুবিধার বিষয় নিয়ে বোট মালিক ও মহাজনদের মাথাব্যথা নেই। সাগরে গেলে মিলবে টাকা আর যেতে না পারলে গচ্ছা দিতে হয় জেলেদের। অনেক জেলে মহাজনের দাদনের টাকা ও এনজিও’র চড়া সুদের ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আবার কেউ পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছে ঋণের বোঝা নিয়ে।
ফদনার ডেইল এলাকার জেলে মোতালেব গাজী এমবি সাগর-২ নামে একটি ফিশিং ট্রলারে সাগরে মাছ ধরতে যান। তিনি বলেন, ‘বোট মালিকের সাথে ৮০ হাজার টাকায় ১০ মাসের চুক্তিবদ্ধ হই। সাগরে যাওয়ার দিনই আমার স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠলে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। একারণে সাগরে যাওয়া হয়নি। অনুপস্থিতির কারণে আমার কাছ থেকে দৈনিক ১৬০০ টাকা করে কেটে নেয়া হয়। যা দাদনের টাকা থেকে হিসাব কষবে মালিক। মালিকের এমন একঘেয়েমীপনায় অতিষ্ট হয়ে উঠছে আমার মত প্রত্যেক জেলে।’
ফিশারী ঘাট এলাকার জেলে করিম মাঝি জানান, ৬ সদস্যের পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জক। ৯০ হাজার টাকা দাদন নিয়েছিলেন। সেই টাকায় চলে তাঁর সংসার। কিন্তু দাদনের টাকা ৬ মাসে শেষ হয়ে যায়। বাকি সময়ে আবারও ধারদেনা করে চলতে হয়।
জেলেরা জানান, নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সাগরে তেমন একটা মাছ পাওয়া যায় না। আবার মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত মাছ শিকার থাকে বন্ধ। প্রতি বছর এই সময়ে জেলে পল্লীতে নেমে আসে দুর্দিন। এ সুযোগটি কাজে লাগায় কিছু অসাধু দাদন ব্যবসায়ী ও অতি মুনাফালোভী মহাজন। ছেলে সন্তান নিয়ে খেয়ে-পরে বাঁচার জন্য এসময় চড়া সুদে এনজিও ও দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নেন জেলেরা। সংসারে সবার মুখে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার তুলে দিতে নিরূপায় জেলেরা এ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অপেক্ষা করেন মৎস্য মৌসুমের।
জুন মাসের শুরুতে বর্ষা ও জোয়ারের পানি দেখে আশায় বুক বাঁধে জেলে পরিবারগুলো। অনেকের ৮/১০ বছরের শিশুপুত্র দিনরাত উপেক্ষা করে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে সামিল হয়। জালের ফাঁকে মাছ আটকালেও ভাগ্যের ফাঁক দিয়ে সেই মাছ চলে যায় মহাজনের মোকামে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার মহিলা কাউন্সিলর শাহেনা আক্তার পাখি বলেন, মৎস্য শিল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর মোটা অংকের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে বাংলাদেশ। আর এই অর্জনের বড় অংশটাই আসছে সমুদ্রে আহরিত মাছ থেকে। এ অর্জনের পেছনে নিরন্তর কাজ করছেন জেলেরা। কিন্তু হিসাবের বেলায় জেলেরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই শুধু সমুদ্রে মৎস্য শিকারে যাওয়া জেলেদের জন্য বাজেটেই আলাদা করে বরাদ্দ রাখার দাবি করছি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে সরকারের উচিত জেলেদের বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি হচ্ছে মৎস্য সম্পদ। আর এই মৎস্য আহরণে নিয়োজিত জেলেদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না কখনোই। ঋণ আর দাদনের নিষ্পেশনে প্রতিনিয়ত ধুঁকছেন তারা। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস.এম খালেকুজ্জামান বলেন, জেলেরা প্রতিনিয়ত ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ছেন, কিন্তু জেলেদের জন্য এখন পর্যন্ত সুদমুক্ত কোনো ঋণের ব্যবস্থা নেই। কোনো ব্যাংক ইচ্ছে করলে তাদের সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করতে পারে।