কক্সবাজার শহর থেকে একটু দূরে দরিয়ানগরের বড়ছড়া এলাকা। ঝিলংজা ইউনিয়নের আওতাধীন এলাকাটি ঘিরে মাদক কারবারিদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। সাগরতীরবর্তী এলাকা হওয়ায় সহজেই মাদকের লেনদেন চলে বড়ছড়া এলাকায়। ১২ থেকে ১৫ জনের চিহ্নিত মাদক কারবারির বসবাস এই এলাকায়। এরমধ্যে অনেকেই ইয়াবাসহ আটক হয়েছে। ইয়াবা বহন করতে গিয়ে অনেকের গাড়িও জব্দ হয়েছে থানায়। মামলা মাথায় নিয়ে অনেকেই রমরমা মাদক কারবার চালাচ্ছে দরিয়ানগর কেন্দ্রিক। এরিমধ্যে থেমে নেই কয়েকজন নারীও। বড়ছড়ার বাসিন্দা না হয়েও অনেকেই মাদক কারবারের জন্য আশ্রয় নিয়েছে এই এলাকায়। প্রভাবশালী মাদক কারবারি হওয়ায় সমাজের নেতারাও সহজে মুখ খুলতে পারছে না তাদের বিরুদ্ধে। তবে দ্রুত সময়ে চিহ্নিত অপরাধী ও মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিকট হস্তক্ষেপ চাইবেন বড়ছড়া সমাজ পরিচালনা কমিটি।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে- বর্তমানে দরিয়ানগরের বড়ছড়া এলাকায় বেপরোয়াভাবে জীবনযাপন করছে কৌহিনুর নামে এক তরুনী। দৃশ্যমান কোন চাকরি বা ব্যবসা না থাকলেও এই তরুনীর চলাফেরা আলিশান। নিয়মিত নামি-দামী প্রাইভেট কার ও নোহা নিয়ে এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিচরণ। তার এমন চলাফেরায় অতিষ্ট খোদ বড়ছড়াবাসী। মাদক কারবারসহ ভিআইপি হোটেল বা রেস্টুরেন্টে তার যাতায়ত রয়েছে বলে এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে। কৌহিনুরের আপন ভাই মাইন। মাইন একজন চিহ্নিত মাদক কারবারি। ইয়াবা পরিবহণ করতে গিয়ে দুইবার ইয়াবাসহ আটক হয়েছিল বড়ছড়া এলাকার মাইন। দুইবারেই কারাগারে যান তিনি। মাইনের পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় বোন কৌহিনুরও ইয়াবা সরবরাহ দেওয়ার জনশ্রুতি রয়েছে এলাকায়।
তবে এবিষয়ে মাইন বলেন- আমি কোন ইয়াবা ব্যবসায়ী নয়। তবে কয়েকজনের ফাঁদে পড়ে ইয়াবা পৌঁছে দিতে গিয়ে ধরা খেয়ে কারাগারে ছিলাম। এখন আর ইয়াবা পৌঁছে দেওয়ার কাজে জড়িত নয়। এসব কাজ থেকে চলে এসেছি।
কোহিনুরের বিষয়ে তিনি বলেন- একসময় আমার বোন নজিওতে চাকরি করত। তবে এখন করে না। এরপর বোনের বিষয়ে আর কোন মন্তব্য করেনি তিনি।
বড়ছড়ার মাদক কারবারিদের মধ্যে কিং হিসেবে রয়েছে আব্দুল খালেকের ছেলে কামাল হোসেন। একবছর আগে ইয়াবাসহ ঢাকায় আটক হয়েছিল কামাল। কয়েকমাস আগে জামিনে বের হয়ে ফিরেছে এলাকায়। মাদক কারবারে আটক হলেও থেমে থাকেনি তার এই অবৈধ কার্যক্রম। বহুবছর ধরে ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়ে কামাল। তার রয়েছে একটি সিন্ডিকেট। কামালের মাদক কারবারের সিন্ডিকেটটি কক্সবাজার শহরে বেশ পরিচিত। এরমধ্যে রয়েছে রফিক। একসময় রফিক বড়ছড়া ও ঝরঝরিকুয়া এলাকায় বসবাস করলেও এখন বসবাস করছে নতুন বাহারছড়া এলাকায়। কামালের মাদক কারবারে অন্যতম পার্টনার রফিক। কামালের আপন ভাই ঈসমাইল। ঈসমাইলও চিহ্নিত একজন মাদক কারবারি বড়ছড়া এলাকার। সিএনজি চালকের আড়ালে ভয়াবহ ইয়াবা ব্যবসা চলে ঈসমাইলের। দুই বছর আগে ইয়াবাসহ উখিয়ায় আটক হয়েছিল ঈসমাইল। দীর্ঘদিন কারাগারেও ছিল। বছরখানেক আগে এলাকায় ফিরে দাপটের সাথে চালাচ্ছে ইয়াবা কারবার। আব্দুল খালেকের পুরো পরিবারটি ইয়াবা কারবারে জড়িত বলে জনশ্রুতি রয়েছে বড়ছড়া এলাকায়। তাদের দৃশ্যমান কোন ব্যবসা না থাকলেও প্রাইভেট কার নিয়ে চলাফেরা কামাল হোসেনের। সুগন্ধা পয়েন্ট কেন্দ্রিক ইয়াবা কারবারের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে কামাল হোসেনের। যারা সুগন্ধা পয়েন্টে ব্যবসার আড়ালে চালাচ্ছে মাদক কারবার।
বড়ছড়া এলাকার আরেক অপরাধ চক্রের হোতা জয়নাল। ওই এলাকার অনেক পুরাতন অপরাধী জয়নাল। রয়েছে মানবপাচার আইনে মামলাও। দরিয়ানগর কেন্দ্রিক অপরাধ চক্রের কথা আসতেই উঠে আসে জয়নালের নাম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর খাতায়ও মানব পাচারকারী হিসেবে নাম রয়েছে জয়নালের। মানব পাচার মৌসুমী ব্যবসা হলেও জয়নালের বিরুদ্ধে রয়েছে ইয়াবা কারবারের তকমা। কলাতলীর শীর্ষ ইয়াবা কারবারি রাসেলের অন্যতম সহযোগি হিসেবে রয়েছে জয়নালের নাম। এছাড়া দরিয়ানগর কেন্দ্রিক ইয়াবা খালাসে জয়নালের সহযোগিতা রয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জয়নাল বলেন- আমি এসব ব্যবসার সাথে জড়িত নয়। সাগর থেকে পোনা সংগ্রহ করে ব্যবসা করে যাচ্ছি। আগে ইট, বালি ও কংক্রিটের ব্যবসা করতাম। এমনকি আমার নামে কোন মামলাও নেই।
বড়ছড়া এলাকার কয়েকজন ইয়াবা ডনের মধ্যে রয়েছে বদিউল আলম। টেকনাফের সাবরাং এলাকার বেলাল নামে একব্যক্তির মাধ্যমে ইয়াবা কারবার চালাচ্ছে বদিউল আলম। ইয়াবাসহ আটকের পরও বদিউল আলমের ইয়াবা ব্যবসা বেড়েছে বহুগুন। বড়ছড়া এলাকার ঠান্ডা মাথার ইয়াবা কারবারি হিসেবে নাম রয়েছে বদিউল আলমের। বদিউল আলমের পার্টনার সাবরাংয়ের বেলাল র্দীঘদিন আস্তানা গেড়েছিল বড়ছড়া এলাকায়। বেলাল দীর্ঘদিন বড়ছড়ায় বসবাস করে বদিউল আলমের সাথে জমজমাট ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করে। কয়েক মাস আগে ইয়াবা লেনদেন নিয়ে তাদের মাঝে বিরোধও তৈরি হয়। একজনের ইয়াবা অন্যজন কৌশলে লুট করেছে বলে জানা যায়। এছাড়া বদিউল আলমের সহযোগি হিসেবে রয়েছে বড়ছড়া এলাকার ছৈয়দ করিম। ইতিমধ্যে ছৈয়দ করিমের ইয়াবার একটি চালান আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর একটি দপ্তর জব্দ করেছে বলে জানা গেছে। বড়ছড়া এলাকায় থেমে নেই পুতু ওরফে মাইল্ল্যা পুতুর গাঁজা ব্যবসা। দীর্ঘদিন ধরে গাঁজা ব্যবসা চালাচ্ছে পুতু। নিজ ঘরে গাঁজার আসরও বসান তিনি। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় গাঁজা সরবরাহ দেন পুতু। জাহেদ বড়ছড়া এলাকার আরেক মাদক কারবারি। চিহ্নিত মাদক কারবারি হিসেবে বড়ছড়ার জাহেদ অন্যতম।
কক্সবাজার বাস টার্মিনালস্থ লারপাড়ায় বসবাস শহরের আলোচিত মাদক কারবারি মোতালেবের। একসময় বাহারছড়ায় বসবাস ছিল মোতালেবের। কিন্তু এই মোতালেবের রয়েছে ইয়াবা ব্যবসা। লারপাড়া এলাকায় বসবাস করে দরিয়ানগর কেন্দ্রিক ইয়াবার কার্যক্রম চালান মোতালেব। দরিয়ানগরের বড়ছড়া এলাকায় তার রয়েছে ইয়াবা পৌঁছে দেওয়ার লোক। মোতালেবের কয়েকজন সিন্ডিকেট রয়েছে বড়ছড়া এলাকায়। ইয়াবা বিক্রি ছাড়াও মোতালেব একজন সেবনকারী। দরিয়ানগর এলাকায় একটি আস্তানাও রয়েছে মোতালেবের। যেখানে নিয়মিত ইয়াবা বিক্রি ও সেবন করেন মোতালেব। এই আলোচিত মাদক কারবারি মোতালেবের ইয়াবা পৌঁছে দিতে সম্প্রতি সময়ে আটক হন বড়ছড়া এলাকার কৌহিনুরের ভাই মাইন। মাইন আটকের সময় একজন মেয়েও ছিল। তবে কৌশলে মেয়েটি ছাড়া পেলেও ইয়াবাসহ আটক হন মাইন। মোতালেবের ইয়াবা নিয়ে আটক হওয়ার বিষয়টি স্বীকারও করেন মাইন।
বড়ছড়া সমাজ কমিটির কয়েকজন সদস্য বলেন- মাদক কারবারিদের আস্তানা হয়ে উঠেছে এলাকাটি। চিহ্নিত মাদক কারবারিরা প্রকাশ্যে ঘুরছে এলাকায়। তাদের দাপটে কেউ কথাও বলতে পারছে না। এতে সমাজের অনেকেই জড়িত মাদক কারবারে। এছাড়া বড়ছড়াবাসী অতিষ্ট হয়ে উঠেছে কৌহিনুর নামে একটি মেয়ের কারণে। তার জীবন-যাপন ও চলাফেরা আলিশান। কাউকে তোয়াক্কা না করেই বেপরোয়া জীবন যাপন করছে সে। এমনকি তার কাছে সমাজের সবাই অসহায়। এক প্রকার সবাইকে আতঙ্কে রেখেছে কৌহিনুর।
কৌহিনুর বড়ছড়ার আতঙ্কের কারণ হিসেবে অনেকেই উল্লেখ করেন- কৌহিনুরের জামাই বোরহান একটি হত্যা মামলার আসামী হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিল। জামাই কারাগারে থাকা অবস্থায় পাল্টে যায় কৌহিনুরের চলাফেরা। বেশ বেপরোয়া জীবন-যাপন শুরু করে কৌহিনুর। অনেকের সাথে তার অবৈধ সম্পর্কের প্রচার রয়েছে এলাকায়। এর একপর্যায়ে কারাগার থেকে বের হয় বোরহান। কিন্তু বোরহানের সাথে আর সংসার করেনি কৌহিনুর। কৌহিনুরের অজানা পথ থেকে ফেরাতে পারেনি বোরহান। এরপর বোরহানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে কৌহিনুর। বোরহান তার গ্রামের বাড়ি উখিয়ায় চলে যায়। কিন্তু এতে আরো বেপরোয়া হয়ে জীবন-যাপন শুরু করে কৌহিনুর। নামি-দামী হোটেল ও রেস্টুরেস্টে অবাধ যাতায়ত। ইচ্ছামতো ছেলেদের সাথে ঘুরাফেরা। ইয়াবা কারবারি ভাই মাইনের হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ইয়াবা পৌঁছে দেওয়াসহ নানান অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে কৌহিনুর। এমনকি প্রাইভেট নোহা ও কার নিয়ে তার অবাধ বিচরণ সবখানে। নিজ এলাকায় ঢুকেন প্রাইভেট কার নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকে তার অশ্লীল নাচ-গান। তাদের রয়েছে টিকটক কেন্দ্রিক একটি মেয়েদের গ্রুপ। এরমধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে নানান অভিযোগ।
বড়ছড়া সমাজের লোকজন জানান- স্বামী বোরহানের সাথে কৌহিনুরের এখনো ডিভোর্স হয়নি। কিন্তু একটি লোকের সাথে সম্প্রতি সময়ে তার অবাধ চলাফেরা। লোকটি প্রশাসনের বলে এলাকায় প্রচার করে কৌহিনুর। তার হাত অনেক লম্বা। তিনি আইনের লোক। নিয়মিত লোকটি বড়ছড়া কৌহিনুরের বাসায় থাকে। অনেক নামি-দামি আসবাবপত্রও ঘরে তুলেন কৌহিনুরসহ ওই ব্যক্তি। ওনিসহ নিয়মিত প্রাইভেট কার নিয়ে এলাকায় যাতায়ত কৌহিনুরের। কিন্তু আয়ের দৃশ্যমান কোন কিছুই দেখছে না এলাকাবাসী। ওই লোকটি নিয়েও সন্দেহ এলাকাবাসীর। কৌহিনুরের বিষয়ে কোন কিছু বললেই প্রশাসনসহ বিভিন্ন জায়গার ভয় দেখান তিনি। যার কারণে সমাজের লোকজনসহ সবাই এক প্রকার আতঙ্ক কৌহিনুরের কারণে। এখন প্রকাশ্যে তার বিষয়ে কেউ মুখ খুলেনা। তার রহস্যজনক জীবন-যাপন সম্পর্কে সবাই অবগত।
এদিকে কৌহিনুরের বিষয়ে অনেক তথ্য-প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ভিডিওসহ নানান কল রেকর্ডও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কৌহিনুরের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ হয়। মুঠোফোনে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পরেই গালিগালাজসহ নানান মন্দ কথা বলেন কৌহিনুর। কোন প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই সাংবাদিক ও সোর্স সম্পর্কে গাল-মন্দ করেন কৌহিনুর। এক পর্যায়ে সংযোগ কেটে দেন তিনি।
এবিষয়ে দরিয়ানগরস্থ বড়ছড়া সমাজ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম বলেন- বড়ছড়া এলাকায় ১০ থেকে ১৫ জন চিহ্নিত মাদক কারবারি ও অপরাধী আছে। যারা বিভিন্ন সময় ইয়াবা নিয়ে আটক হয়েছিল। আটক হওয়ার পরও তাদের ব্যবসা থেমে নেই। তাদের কারণে এলাকাটি ধংস হওয়ার পথে। তারা এলাকায় বেশ দাপটে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ সহজে মুখ খুলতে পারেনা। সবাই চিহ্নিত মাদক কারবারি। এমনকি কয়েকজন নারীও রয়েছে এই কারবারে। যাদের চলাফেরা রহস্যজনক। কারা মাদক ব্যবসা করে এটা সবাই জানে। তবে দ্রুত সময়ে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সমাজের পক্ষ থেকে প্রশাসন বরাবরে অভিযোগ দায়ের করা হবে।
দরিয়ানগরস্থ বড়ছড়া সমাজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মাহাবুব আলম বলেন- মাদক নিয়ে আটকের পর জেল ফেরত অনেক আসামী বড়ছড়া এলাকায় থাকেন। মাদকসহ জব্দ হয়ে থানায় রয়েছে অনেকের গাড়িও। তারা সবাই চিহ্নিত। নারী-পুরুষ মিলে মাদকের একটা সিন্ডিকেটের অবস্থান বড়ছড়া এলাকায়। মামলা বা অভিযোগ নেই এমন অনেকেই আছে মাদক কারবারে। তাদের বিরুদ্ধে সমাজে পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহযোগিতা চাওয়া হবে।