ভয়েসওয়ার্ল্ড অনুসন্ধান:
ইয়াবায় দ্বিতীয় টেকনাফে পরিণত হয়েছে কক্সবাজার সদরের খরুলিয়া। প্রায় প্রতিটি ঘরে চলে ইয়াবা কারবার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ি বাড়লে পাল্টে যায় ইয়াবা পাচারের কৌশল। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশলে রমরমা কারবার চলছে ইয়াবার।
গোটা বৃহত্তর খরুলিয়ার অর্ধ-শতাধিক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে ছোট বড় প্রায় শতাধিক চিহ্নিত স্পটে নিয়মিত চলছে মাদকদ্রব্যের রমরমা বানিজ্য। এর বাইরেও আছে ছোটখাটো অসংখ্য স্পট। এদের অনেকে বিভিন্ন মামলায় জেলহাজতে থাকলেও জেলে বসে, এমনকি অনেকে আড়ালে থেকেও নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের মাদক সাম্রাজ্য।
সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বৃহত্তর খরুলিয়ার চিহ্নিত মাদকের স্পট ৫০ টির উপরে। তবে ভয়েসওওয়ার্ল্ড এই এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের নিয়ে আলাদা আলাদা প্রতিবেদন তৈরীতে অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে। শুরুতেই খরুলিয়া বাজার কেন্দ্রিক মাদক কারবারিদের বিষয়ে তুলে ধরা হলো।
এলাকাবাসীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মূলত খরুলিয়া এলাকাটিতে রামু ও সদর উপজেলার সীমানা এবং বাঁকখালী নদী থাকায় অনেকটা ভৌগোলিক সুবিধার কারণে অন্যান্য এলাকার তুলনায় এই এলাকা ঘিরে মাদক ব্যবসা বেশি জমজমাট।
অভিযোগ আছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অসৎ কিছু সদস্য, পুলিশের সোর্স, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের কেউ কেউ মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত বখরা নিয়ে তাদেরকে মাদক ব্যবসায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সহয়তা করছে। ফলে খরুলিয়ার কিছু চিহ্নিত এলাকায় ইয়াবা, মদ, গাঁজাসহ সব ধরনের মাদকই এখন পেঁয়াজু-চনার মতো সহজলভ্য। খরুলিয়া এলাকাটি সদর থানা এলাকার মাদকের মূল আখরা হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাদকের সাথে রয়েছে গভীর সংশ্লিষ্টতা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে খরুলিয়া ডেইঙ্গাপাড়া এলাকার মৃত মোস্তফার ছেলে সাইদুল (সাইদ্দ্যা) নামে এক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর নাম। তিনি স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগীতায় সারাদেশে ইয়াবার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেন। এবং নিজ বাসায় ইয়াবা সেবন, বিক্রি ও নানা অনৈতিক কার্যকলাপ চালিয়ে আসছেন।
সাইদুল নিজে প্রতিদিন ১০/১৫ টি ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করেন। যার আনুমানিক মূল্য তিন থেকে চার হাজার টাকা। গড়ে প্রতিদিন কেউ শুধুমাত্র তিন/চার হাজার টাকার ইয়াবা সেবন করলে তার মাদক সেবনেই মাসিক ব্যয় নব্বই হাজার টাকা থেকে এক লাখ বিশ হজার টাকা। তাহলে এত টাকার উৎসই বা কি- প্রশ্ন রইলো?
কোনার পাড়া ও হিন্দুপাড়া এলাকায় মৃত ফকির আহাম্মদের ছেলে জুহুর আলম, শহর মুল্লুকের ছেলে হাসান, মৃত জাফর আলমের ছেলে মনির আলম (মনিয়া) ও বজলের ছেলে সাইফুল। মুলত এরা চারজনের সিন্ডিকেট বর্তমানে খরুলিয়া থেকে সারাদেশে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা সরবরাহ করছে।
তবে কিছুদিন ধরে ইয়াবার ছোট চালান যায় নাছির উদ্দিন নামের একজনের হাত থেকে। তিনি গত বছর দুই হাজার ইয়াবাসহ চট্টগ্রাম পুলিশের হাতে আটক হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করে জামিনে বেরিয়ে আসেন।
কোনার পাড়া-হিন্দুপাড়ার মাঝখানে ভাঙ্গাব্রীজ এলাকায় মুন্সিয়া তার মা চিয়নী, ইয়াছমিন তার মা ও বোন নুরুন নাহারসহ স্বপরিবারে দীর্ঘ দেড় যুগের বেশি সময় ধরে প্রকাশ্যে চালিয়ে যাচ্ছে খুচরা মাদকের রমরমা বানিজ্য। মূলত এই পরিবারটির নারীরা ভ্রাম্যমাণ পতিতা। এক সময় গাঁজা বিক্রি করলেও এখন ইয়াবা ও ফেন্সিডিল ব্যবসা করে। তাদের কাছ থেকে ফেন্সিডিল নিয়ে যায় টেকনাফের ছেনুয়ারা। ছেনুয়ারার বোন কিছুদিন আগে ফেন্সিডিল সহ গ্রেপ্তার হয়েছিল।
ইয়াছমিন, ছেনুয়ারাসহ এই সিন্ডিকেটকে ফেন্সিডিল সরবরাহ করে চট্টগ্রামের ফেন্সিডিল মাফিয়া হোসাইন।
খরুলিয়ার বাজার পাড়া এলাকার ইউসুফ আলীর ছেলে লিয়াকত, দেলোয়ার ও শওকত আলী পুতু (পুতিয়া) তারা সহোদর তিন ভাই পাইকারী ও খুচরা মাদক ব্যবসায়ী। তিন জনেই মাদক ও অস্ত্র মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগ করে এলাকায় ফিরে আবারো পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা ব্যবসা। তাদের প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করে মেহেদী ও কাজল। তাছাড়া গ্রেপ্তার এড়াতে সু-চতুর ইউসুফ আলী নিজেই স্বপরিবারে তাদের বউ বাচ্চাকে মাদক বহনে ব্যবহার করে। পুরো পরিবারের স্বস্ত্রীক মাদকের ডজনখানেক মামলাও রয়েছে।
কোনার পাড়ায় মাদক বিক্রি নিয়ন্ত্রন করছেন মনির আলম প্রকাশ মনিয়া। সহকারী হিসেবে রয়েছে তার বন্ধু ডেইঙ্গাপাড়ার পারভেজ। মনিয়া ও পারভেজের সেলসম্যান হিসেবে রয়েছে তার ভাই রায়হান।
খরুলিয়া নয়াপাড়া এলাকার দুর্ধর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে মমতাজ মিয়ার ছেলে সাদ্দাম ও মুসলিম তাদের স্ত্রী কাজলি এবং তানিয়া, ফজলের ছেলে রিয়াজ উদ্দিন ও আফলাতুন। পকেটমার আলমের বউ আনোয়ারা বেগম, তার ছেলে এরশাদ উল্লাহ। আব্দুল খালেকের ছেলে বাদশা তার স্ত্রী নাছিমা।
মৃত আব্দুল মোনাফের ছেলে ছালাম মিয়া, বশির আহাম্মদের ছেলে আব্দুল মালেক। বর্তমানে ইয়াবা ও অস্ত্রসহ কারাভোগ করে ফেরা নুরাইয়া’র (নুরু) স্ত্রী রাশুবুড়ি। ভাগিনা জিয়া। মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে আব্দুল খালেক তার স্ত্রী শানু। মোহাম্মদ শফির ছেলে রাহামত উল্লাহ, শামসুল আলমের ছেলে রায়হান ও সইসোনার মেয়ে বাবুনি প্রকাশ বাবুজ্জ্যানি।
এরা নয়াপাড়া ও আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই বাবুজ্জ্যানি কুখ্যাত মাদক সম্রাজ্ঞী বর্তমানে তার স্বামীসহ ঢাকায় সিন্ডিকেটের চালান পাচার করছে। সে বিয়ে করে স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে পুরোদস্তুর মাদক কারবারে ব্যস্ত।
এদিকে ডেইঙ্গাপাড়া থেকে শুরু করে রামু ও সদর উপজেলা মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে সাইদ্দ্যার লোকজন। অপরদিকে মৃত মকতুল হোসেনের ছেলে শাহ জাহানের নামও এলাকার মাদক বিক্রেতাদের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে।
খরুলিয়া টেক এলাকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে ইরহাম নামে এক মাদক ব্যবসায়ী। তিনি উঠতি বয়সের কয়েকজন ছেলেকে দিয়ে এলাকায় ইয়াবা সাপ্লাই দিয়ে আসছে। প্রতিদিন সকালে কোনারপাড়ার জুহুর আলম নামে এক ব্যাক্তি এলাকা থেকে মোটরসাইকেলযোগে এসে ইরহামকে ইয়াবার চালান দিয়ে যায়। বৃহত্তর খরুলিয়ায় উল্লেখিত মাদক ব্যবসায়ীদের গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রিতে নিয়োজিত রয়েছে প্রায় তিন ডজন টোকাই ও ভ্রাম্যমাণ পতিতা।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সহযোগিতায় চিহ্নিত এসব স্পটে নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যায় মাদক ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে সদর ও রামু থানা পুলিশের কথিত সদস্যরা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নিয়ে মাদক ব্যবসায় সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে মদ, গাঁজার পাশাপাশি এ এলাকায় ইয়াবার ব্যবসা চলে সবচেয়ে বেশি। এসব অর্থ সংগ্রহ করছে পুলিশের সোর্স নামধারী মাদক ব্যবসায়ীরাই।
বৃহত্তর খরুলিয়ার যেসব এলাকাকে মাদক ব্যবসার স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঘাটপাড়া, কোনারপাড়া, নয়াপাড়া, হিন্দুপাড়া, টেক, সিকাদর পাড়া, দরগাহ পাড়া, মেহেরআলী পাড়া, চরপাড়া, খামার পাড়া, ভূতপাড়া, বেপারিপাড়া, মাষ্টার পাড়া, চেয়ারম্যান পাড়া, মকবুল সওদাগর পাড়া, পূর্ব মুক্তারকুল, ডেইঙ্গাপাড়া, সুতারচর ও বাজারপাড়া। এইসব এলাকা মাদকের স্পট হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
তবে মাষ্টার পাড়া এলাকায় পুলিশের কথিত সোর্স সিল্কী মিজান ও বাজারপাড়ায় ঢাকায়ার নাতী নামে পরিচিত মুরশেদের ইয়াবা স্পট, ঘাটপাড়ার গুন্ডায়ার ছেলে কামালের ইয়াবা স্পট, কোনার পাড়ার মৃত শেহের আলীর ছেলে মুফিজের বাংলা মদ ও গাঁজার স্পট, ভাঙ্গাব্রীজ এলাকায় ইমাম শরীফের ভাড়া বাসা এলাকায় রয়েছে মৃত খুইল্যা মিয়া সহোদর ভাই মজিদের (গাঁজাটি পরিবার) ইয়াবা, গাঁজা ও বাংলা মদের স্পট।
এ ছাড়া দরগাহ পাড়া এলাকায় ও বাংলাবাজারের পূর্ব পাশে নাছির উদ্দিন, শফি আলম, হালিমুর রশিদ, ইরফান সিকদান, জাহাঙ্গীর আলম, খোরশেদ, মাহাবুব উল্লাহ, মুজিব উল্লাহ।
বেপারীপাড়া এলাকায় মাহাম্মদ আলী, হোসেন, শহিদুল্লাহ, রমজান আলী, কলিম উল্লাহ, ইলিয়াস, শফিক, মুবারক আলী। মকবুল সওদাগর পাড়ায় আয়াছুর রহমান ও সানিসহ প্রত্যেকের নিয়ন্ত্রিত মাদকের স্পট রয়েছে। এ ছাড়া নয়াপাড়া এলাকায়, আবু তাহের ও তার স্ত্রী নিজ বাড়ীতেই বসায় সকাল-সন্ধ্যা মাদকের জলসা।
স্থানীয় সচেতন মহল বলেন, চিহ্নিত এসব মাদক ব্যবসায়ীর অধিকাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। অনেকে আবার রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় চালিয়ে যাচ্ছে মাদক ব্যবসা। বিভিন্ন সময়ে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না; যাওয়া সম্ভব হয় না মাফিয়াদের ধারে কাছেও।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে খরুলিয়া এলাকার কিছু কিশোর মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এদের বেশির ভাগই ইয়াবা আসক্ত। বিশেষ করে ঘাটপাড়া, নয়াপাড়া ও কোনার পাড়া এলাকায় ইয়াবায় আসক্ত কিশোরের সংখ্যা অনেক বেশি।
উল্লেখ্য, গত বছর সদর থানা পুলিশের একটি দল ইয়াবা বিক্রির সময় নুরু, পুতু, লিয়াকত, দেলোয়ার ও দিদারকে মাদক ও অস্ত্রসহ হাতেনাতে আটক করেছিলেন। বর্তমানে তারা জামিনে ফিরে আবার পুরোদমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তারমধ্যে জেল ফেরত মাদক স¤্রাট দিদার কয়েকদিন আগে তার দুই সহযোগী নিয়ে ১৩ হাজার ইয়াবাসহ চট্টগ্রামে র্যাব ৭ এর হাতে আটক হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন। কিছুদিন আগে পশ্চিম মুক্তারকুল এলাকার মৃত আব্দুর শুক্কুরের ছেলে নবী হোসেন দিনেদুপুরে খরুলিয়া বাজারে ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় ইয়াবা বিক্রির সময় তাকে জনতা ধরে বেধড়ক গণধোলাই দেয়।
পরে জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেয় এবং পুলিশের হাতে তাকে সোপর্দ করেন। পরদিন সে মারা যান। ঘটনাটি সারা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। এছাড়াও চরপাড়া এলাকায় মাদক বিক্রিতে বাঁধা দেওয়ায় গ্রামবাসীর উপর মাদক ব্যবসায়ীরা গুলি বর্ষণ করে। এতে নারী শিশুসহ ১০/১২ জন আহত হন।
মাদক-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে হতাহতের ঘটনা অনেক আছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে কক্সবাজার সদরের খরুলিয়া এলাকাটি বর্তমানে পরিচিতি অন্যতম প্রধান মাদকপ্রবণ এলাকা হিসেবে।