নাম নুরুল আমিন প্রকাশ কালু (৩৬)। বাবা মনির আহাম্মদ ছিলেন দিনমজুর। দাদা-দাদি ছিলেন ভিক্ষুক। কক্সবাজার সদরের খরুলিয়া কোনার পাড়া গ্রামের একটি জরাজীর্ণ বাসায় বাসবাস করতেন পরিবারটি। আর্থিক অনটনে পড়ালেখায় স্কুল, মাদ্রাসা ও মক্তবসহ কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাটিতে পা রাখা হয়নি পরিবারটির কোনো সন্তানদের। ছোট বেলায় অভাবের সংসারে জীবন যুদ্ধে নেমে রাখালের কাজ নেন এক প্রতিবেশীর বাসায়। এভাবে কয়েক বছর যেতে না যেতেই কিশোর বয়সের শুরু থেকেই বনাঞ্চলের কাঠ কেটে কাঁধে বোঝাই করে এনে বাজারে লাকড়ী বিক্রি করে সংসারের হাল ধরেন কালু। এরপর থেকে কাঠ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা কালুর উত্থানের কাহিনী সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৯ সাল পর্যন্ত কাঠ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসলেও ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তার শশুর বাড়ির লোকজনকে নিয়ে গড়ে তুলেন এক মাদক পাচারকারী সিন্ডিকেট। এরপর থেকে তাকে পেছনে ফিরে থাকাতে হয়নি। ৪-৫ জনের এই সিন্ডিকেটে অন্যতম ছিলেন রাখাল ছেলে কালু। প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত বাবুনি প্রকাশ বাজুজ্জানি চিহ্নিত ইয়াবা কারবারি কালুর সমন্ধি কামাল ও তার ভাবি বাহাদুরের স্ত্রী শামসুন নাহার প্রকাশ শহিসোনা।
জানা গেছে, সিন্ডিকেটটিতে বর্তমানে রয়েছে কালুর স্ত্রী জোনাকী, শশুর বাড়ির একাধিক আত্মীয়-স্বজন, কয়েকজন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনসহ কালুর মালিকাধিন গাড়ি চালক জানু বড়ুয়া ও বিকাশ দোকানদারসহ আরও অনেকে। এদের মধ্যে বাবুজ্জানি এবং তার স্বামী শরীফ ও কামাল মাদকের চিহ্নত গডফাদার বলে জানা গেছে।
সিন্ডিকেটটি টানা কয়েক বছর একযোগে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে হয়ে যান বিপুল বিত্তভৈববের মালিক। কিছুদিন ব্যবসা চালিয়ে যেতে না যেতেই ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি কালুর ইয়াবার একটি চালান পাচারের সময় খরুলিয়া গরুর বাজার এলাকার ইয়াছিন ক্রোকারীজের দোকানের সামনে থেকে তার সমন্ধি কামাল ও তার ভাবী শামসুন নাহার প্রকাশ শহিসোনাব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) হাতে আটক হন। সে সময় ১০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওই মামলা থেকে বাদ পড়ে যান ইয়াবার চালানটির মুল মালিক কালু।
তখন আর্থিক লেনদেনসসহ সিন্ডিকেটটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে ভেঙ্গে যায় ব্যবসায়ীক বন্ধন। এরপর থেকে প্রত্যকেই পৃথক পৃথকভাবে ইয়াবা সম্রাজ্য গঠন করে।
তথ্য বলছে, ২০২২ সালের শুরুর দিকে ঢাকায় কালুর ইয়াবার একটি চালান পাচার করতে গিয়ে ডিবি পুলিশের হাতে আটক হন তার গাড়ি চালক জানু বড়ুয়া ও নিরঞ্জন শর্মা নামের দুই পাচারকারি। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৩ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে ডিবি।
এরপর কালু মাদক ব্যবসাকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পরে খরুলিয়া বাজারে খোলে বসেন একটি ফার্নিচারের দোকান। ফার্নিচার ব্যবসার আড়ালে থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন কোটি কোটি টাকার মাদক ব্যবসা। রাজার হালতে সেই থেকে আজ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন ইয়াবা পাচার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। বনে যান কোটি কোটি টাকার মালিক। ভিকারির ছেলে অল্প বয়স এবং স্বল্প সময়ে বিপুল অর্থের মালিক হয়ে হিতাহিত জ্ঞাত হারিয়ে ফেলে। অবৈধ অর্থ তাকে বেপরোয়া করে তুলে। টাকার গরমে এলাকার সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার-জুলুম শুরু করে। এলাকার মানুষ তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস কারও নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সময়ের রিক্তহস্ত কালু খরুলিয়া কোনার পাড়া এলাকায় ক্রয় করেছেন ১ গন্ডা জমি। সেখানে গড়ে তুলেছেন সেমিপাকা ভবন। এছাড়াও কোনার পাড়া এলাকার নুরুন নবীর বাড়ির সামনে ক্রয় করেছেন ২০ শতক জমি। ঝিলংজার দক্ষিণ ডিক্কুল এলাকায় ক্রয় করেছেন ৩ গন্ডা জমি। পিএমখালী ইউনিয়নের পাতলী এলাকা থেকে দুটি দলিলে দু’জায়গায় ক্রয় করেছেন ৮০ শতক জমি। খরুলিয়ার ডিক্কুল বিল নামক জায়গায় ক্রয় করেছেন ১০ শতক জমি। সম্প্রতি বাহাদুর নামের একজনের কাছ থেকে পাতলী এলাকায় ক্রয় করেছেন ৩০ শতক জমি।
যদিও বাহাদুরের দাবি, জমিটি কালুকে বিক্রি করার চুক্তি হয়েছে; অর্ধেক টাকাও নিয়েছেন। তবে এখনো সেটি রেজিস্ট্রি হয়নি। খরুলিয়া বাজারে একটি ফার্নিচারের দোকান, ৪০ টি সিএনজি ও ৪ টি মিনিট্রাক রয়েছে। এই গাড়িগুলো মূলত মাদক পাচারের কাজে ব্যবহৃত হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে বিপুল টাকার সম্পত্তি ক্রয় রয়েছেন এই মাদক সম্রাট।
স্থানীয়রা জানান, কালু একজন চিহ্নত মাদক ব্যবসায়ী। বর্তমানে ফার্নিচারের দোকান ও গাড়িগুলো দেখভাল কারার আড়ালে পুরনো ইয়াবা সিন্ডিকেটটি সক্রিয় করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, আগে গোপনে বিক্রি হলেও গত দুই বছর ধরে কালুর মাদকের চালান প্রকাশ্যে ফার্নিচারের ভেতরে করে পাচার করছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
সূত্রের দাবি, গত ১৫ এপ্রিল খরুলিয়া নয়াপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা ও ইয়াবা বিক্রির নগদ ২ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ টাকাসহ গোলাব জান ও তার মেয়ে নাসিমা আক্তারকে আটক করে র্যাব। সেই ইয়াবা এবং নগদ টাকাগুলোর মূল মালিক ছিলো কালু। কৌশলগত কারণে পাচারের উদ্দেশে ওই বাড়িতে ইয়াবাগুলো মজুদ করেছিলেন।
বর্তমানে কালুর মাদক পাচার করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়ে সমাজের নিম্নভিত্ত পরিবারের অসংখ্য নারী-পুরুষ কারাগারে রয়েছেন।
এইসব ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, মাদকের চালান পাচার করতে গিয়ে আটক কিংবা ধরা পড়লে কালুর নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। যদি কেউ ধরা পড়ে সেই ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ ও জামিনের ব্যবস্থা করা হয়। এ কারণে ইয়াবাসহ তারা আটক হলেও কালুর নাম প্রকাশ না করার কারণে অর্ধবার তার মাদকের চালান আটক হলেও কালু রয়ে যায় অধরা। মামলা হয়না তার নামে।
ফার্নিচার ব্যবসায়ীরা বলছেন, কালুর পড়ালেখায় অশিক্ষিত হলেও মাদক কারবারে একেবারেই পাকাপোক্ত। প্রথমে তার মাদকের চালান নিয়ে তার সমন্ধি কামাল, ভাবি সহিসোনা; পরে ঢাকায় তার গাড়ি চালক জানু বড়ুয়া ও নিরঞ্জন শর্মা ইয়াবাসহ আটকের পর আস্তে আস্তে কালুর মাদক কারবারের বিষয়টি স্থানীয়দের মাঝে জানা জানি হয়। এরপর থেকে তার সম্পদের বিবরণী দেখে অনেকের চোখ কপালে উঠে যায়।
ফার্নিচার ব্যবসায়ীদের দাবি, কালু তার নিজস্ব মিনিট্রাকে করে টেকনাফে ফার্নিচার পাঠায়। পরে সেগুলো ফেরত আনার নামে ফার্নিচারের ভেতরে করে ইয়াবা নিয়ে আসে। একই গাড়িতে করে ফার্নিচারের বিভিন্ন অংশের ভেতরে করে কৌশলে কোটি কোটি টাকার মাদক পাচার করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। মাঝেমধ্যে পাচারকারি আটক হলেও কালু বরাবরই থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।
কালুর মিনিট্রাক চালক জানু বড়ুয়া বলেন, ‘কালুর নিজস্ব গাড়ির ড্রাইভার ছিলাম আমি। সেদিন ফার্নিচারে করে ইয়াবার একটি চালান ঢাকায় নিয়ে গেলে ডিবি পুলিশের হাতে আমরা ধরে পড়ে যাই। তখন তিন হাজার ইয়াবা নিয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগও করেছি। সে সময় আমার স্ত্রী অন্তঃসত্বা থাকায় খুব আর্থিক অনটনে পড়ে আমার পরিবার। ইয়াবার মূল মালিক কালু হলেও আমাকে জামিনে বের করতে তিনি নূন্যতম সহযোগীতা করেনি।’
জানু আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে পেটের দায়ে বর্তমানে কালুর আরেকটি গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি। এখনো তিনি একই কায়দায় মাদক পাচার করছে। কখন যে ধরা পড়ে যাই ভগবান জানে।’
কালুর ইয়াবা চালান পাচার করতে গিয়ে কারাভোগ করা নিরঞ্জন শর্মা বলেন, ‘একটি মারামারি মামলায় কিছুদিন কারাভোগের পর জামিনে বের হয় আর্থিক অনটনে পড়ে যায় আমি। তখন কালো ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে তার একটি ফার্নিচারের চালান নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তাব দেন। তার গাড়িতে করে ফার্নিচারগুলো নিয়ে গেলে ডিবি পুলিশ আমাদের আটক করে। পরে পুলিশ তল্লাশী করে ফার্নিচারের ভেতরে বিশেষ কায়দায় লুকানো তিন হাজার ইয়াবা জব্দ করা হয়।’
ফার্নিচারের ভেতরে থাকার ইয়াবা থাকার বিষয়টি তিনি জানতেন না বলে দাবি করে নিরঞ্জন শর্মা বলেন, ‘তখন ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াবার মূল মালিক কালু বলে জানিয়েছিলাম। পুলিশ তার সাথে যোগাযোগ করলে কালু বিকাশের মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকা পাঠিয়ে মামলা থেকে তার নাম বাদ দেওয়া ব্যবস্থা করেন। পরে আমাকে ১৪ শত আর ড্রাইভার জানু বড়ুয়াকে ১৬ শত পিস ইয়াবা দিয়ে কোর্টে চালান করে দেন পুলিশ।’
আব্দুর রহিম নামের এক ফার্নিচার ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি দুই যুগ ধরে ফার্নিচারের ব্যবসা করে একটি ঠিক মতো বাড়ি নির্মাণ করতে পারিনি। ফার্নিচার ব্যবসার আড়ালে অল্পদিনে মাদক কারবারি কালুর সম্পত্তির হিসাব দেখলে যেকারো চোখ কপালে উঠবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কোনার পাড়া এলাকার এক যুবক বলেন, ‘রাত গভীর হলে মাদক কারবারি কালুর বাড়িতে সিএনজি যোগে বড় বড় ব্যাগ হাতে বিভিন্ন অচেনা লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়। এছাড়াও তাকে প্রতিদিন বিভিন্ন বিকাশের দোকান থেকে লাখ লাখ টাকা উঠাতে দেখা যায়। কেউ জিজ্ঞেস করলে সেগুলো ফার্নিচারের লেনদেন বলে দাবি করে কালু।’
জানা গেছে, খরুলিয়া এলাকাটি বাঁকখালী নদী ও মহাসড়ক সংলগ্ন হওয়ায় অনেকটা ভৌগোলিক সুবিধার কারণেই মাদকের ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। মাদক ব্যবসায় নিত্য নতুন জড়িয়ে পড়ছে কালুর মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেকে। বাসের চালক ও কর্মচারীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে কালুরা কোটি কোটি টাকার মাদকের চালান অনায়াসে পাচার করে আসছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কালুদের পাচারকারি আটক হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন কালুরা। এ কারণে কমছে না মাদকের ভয়াবহতা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল আমিন প্রকাশ কালু বলেন, ‘বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংকে থেকে ঋণের মাধ্যমে তিনি দুইটি সিএনজি ক্রয় করেন। এবং বাহাদুর নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কিছু জমি ক্রয় করেন। অর্ধেক টাকা দিতে পারলেও অভাবের কারনে বাকি টাকা দিতে না পারায় এখনো জমি রেজিস্ট্রি করতে পারেননি। এছাড়াও মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কক্সবাজার শাখার উপ-পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, ‘ওই এলাকাটিতে চিহ্নত মাদক ব্যবসায়ীর আনাগোনা বেড়েছে বলে জানতে পেরেছি। কয়েক বছর আগেও অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ তার দুই আত্মীয়সহ একাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করেছি। তারেও নজরে রাখছেন বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।’
দুদকের সমন্বিত কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক তুষার আহমেদ বলেন, ‘কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে হেড অফিসের সাথে সমন্বয় করা হয়। পরে তাদের নির্দেশক্রমে তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেবে দুদক।’
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাদকের শিকড় যত গভীরে থাকুক আমরা খোঁজে বের করব। তার বিরুদ্ধে খোঁজ-খবর নিয়ে অ্যাকশন নেওয়া হবে।’