আরফাতুল মজিদ
মোহাম্মদ শাহ আলম। সবাই চিনেন রোহান নামে। পিতা-মাতা কেউ জীবিত নেই। কক্সবাজার সিটি কলেজের অনার্স (বিজ্ঞান বিভাগ) ৪র্থ বর্ষের ছাত্র। রোহান টেকনাফ সদর ইউনিয়ন ৪নং ওয়ার্ড নতুন পল্লানপাড়া এলাকার মৃত বশির আহমদের ছোট ছেলে। রোহানার আপন এক ভাই রয়েছে টেকনাফে। একসময় শিক্ষকতা করত এলাকায়। এখন রাজনীতির সাথে জড়িত।
প্রায় তিন বছর ধরে রোহান কক্সবাজার শহরে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করে আসছে। শুক্রবার দুপুরে শহরের তারাবনিয়ারছড়া জামে মসজিদের পূর্ব পাশ্বে হাজেরা পারভিনের মালিকানাধীন ৫ম তলা বিল্ডিং এর ৪র্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে রোহানকে গ্রেফতার করে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ।

এসময় রোহানের দুই সহযোগি ঈদগাঁও ২নং ওয়ার্ড সিকদার পাড়া এলাকার মোতাহের আহমদের ছেলে এমদাদুল হাসান ও দক্ষিণ রুমালিয়ারছড়া ৭নং ওয়ার্ড এলাকার মো. রশিদের ছেলে তৌহিদুল হাসানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ১৬ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট, মাদক কারবারে ব্যবহৃত ৪টি স্মার্ট মোবাইল, ২টি বাটন মোবাইল ফোন এবং মাদক বিক্রির নগদ ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা জব্দ করা হয়।
রোহানের লাইফ স্টাইল :
প্রথমে শাহ আলম ওরফে রোহান কক্সবাজার শহরের সাহিত্যিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় একটি রুমে ভাড়া থাকতেন। প্রায় এক বছর সেখানে ছিলেন। এরপর তারাবনিয়ারছড়া জামে মসজিদের পূর্ব পাশ্বে হাজেরা পারভিনের মালিকানাধীন ৫ম তলায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। যে ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া প্রায় ১৪ হাজার টাকা। প্রায় দুই বছর থেকে ওই বিল্ডিংয়ে রোহানের বসবাস।

গত সাত মাস আগে ৫ম তলা থেকে ৪র্থ তলায় নেমে আসে। রোহানের সাথে তার ফ্ল্যাটে নিয়মিত থাকতেন আলমগীর। আলমগীর টেকনাফ লেঙ্গুরবিল আদর্শগ্রাম এলাকার বাসিন্দা। তবে কক্সবাজার সিটি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র আলমগীর। রোহান ও আলমগীর একই ফ্ল্যাটে থেকে ব্যবসা করতেন ইয়াবা ট্যাবলেটের। তাদের ব্যবসা চলছে জমজমাটভাবে। তাদের ফ্ল্যাটে নিয়মিত যাতায়ত ছিল টেকনাফ ও কক্সবাজার শহরের অনেক ইয়াবা কারবারির।

টেকনাফ থেকে তাদের সিন্ডিকেটরা ইয়াবা এনে মজুত করত রোহানের ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটে কক্সবাজারের একাধিক ব্যবসায়ীরা গিয়ে ইয়াবা কিনে আনত। শহরের কয়েকজন যুবকের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয় রোহানের। তাছাড়া স্থানীয় কয়েকজন যুবককে শক্তি হিসেবে কাছে রাখত রোহান। বছরখানে আগে রোহান ও আলমগীরের সম্পর্ক ভেঙে যায়। যার কারণ হিসেবে; আলমগীরের একটি ইয়াবার বড় চালান রোহানের ইন্ধনে একটি গ্রুপ লুট করে। যার পিছনে ছিল রোহান। এতে তাদের দুইজনের সম্পর্ক ভেঙে যায়।
এবিষয়ে আলমগীর বলেন, রোহানের সাথে আমি এক ফ্ল্যাটে থাকতাম কিন্তু ইয়াবা ব্যবসা করিনি। আমার কোনো ইয়াবা লুট হয়নি। তবে এক বড়ভাইয়ের ইয়াবা লুটের বিষয়ে রোহানের সাথে বিচারে বসছিলাম। আপাততে বড় ভাইয়ের নাম বলতে পারছি না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহ আলম ওরফে রোহান শীর্ষ একজন ইয়াবা কারবারি। তারমতো আরেক ইয়াবা কারবারি হল ঈদগাঁও ২নং ওয়ার্ড সিকদার পাড়া এলাকার মোতাহের আহমদের ছেলে এমদাদুল হাসান ওরফে রিমন (বর্তমানে গ্রেফতার)। তারা দুজন জমজমাট সিন্ডিকেট। রোহান ও রিমনের এই ইয়াবা কারবারের উত্থানের পিছনে রয়েছে সাইমন মোহাম্মদ জসিম। জসিমের বাড়ি টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মিঠাপানির ছড়া এলাকায়। টেকনাফ ষ্টেশনে উপরের বাজারে জসিম স্টোরের মালিক এই জসিম।

ওসি প্রদীপের আমলে পলাতক ছিল এই জসিম। পালিয়ে আশ্রয় নেন কক্সবাজার শহরের গাড়ির মাঠ এলাকায়। গাড়ি মাঠ এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন জসিম। এরিমধ্যে (ওসি প্রদীপের আমলে) বিভিন্ন সময় দুবাই ও মালয়েশিয়া পালিয়ে গিয়ে নিজেকে রক্ষা করে জসিম। তবে গাড়ির মাঠের ফ্ল্যাট বাসায় তার দ্বিতীয় স্ত্রী থাকতেন। দুই মাস পরপরেই দুবাই ও মালয়েশিয়ায় সফর করত জসিম। অনেকেই তাকে দুবাই জসিম হিসেবে চিনেন। টেকনাফে ইয়াবা ট্যাবলেটের বড় ভেন্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল জসিম।
কক্সবাজার শহরে রোহানের বড় ভাই হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ছিল জসিম। জসিমের গাড়ির মাঠ বাসায় নিয়মিত যাতায়ত ছিল রোহানের। জসিমের ছিল নিজস্ব কয়েকটি প্রাইভেট কার ও মোটর সাইকেল। রোহানের বন্ধুরা জসিমকে তার বড় ভাই হিসেবে চিনত। কারণ- জসিমের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়ত ও লেনদেনসহ সব কিছু করত রোহান। টেকনাফ থেকে যখন জসিমের স্ত্রী আসত তখন তাকে নিয়ে হোটেল সাইমনে থাকত জসিম। এই সবকিছু ম্যানেজ করত রোহান।
রোহানের এক কলেজ বন্ধু জানান, রোহানের জীপন-যাপন কোটিপতি স্টাইলে। সবখানে টাকা খরচ করত। নামী-দামি কয়েকটি আইফোন ব্যবহার করত। আলিশান গাড়ি নিয়ে কক্সবাজার শহরে চলাফেরা তার। তার আলিশান চলাফেরা দেখে টেকপাড়া এলাকার আব্দু হোসেন, জামশেদ ও ইয়াছিন বেশ কয়েকবার তুলে দিয়ে যায় রোহানকে। পরে তাদের ম্যানেজ করে চলে আসে। কালুর দোকানের ভিতরে একটি রিকশার গ্যারেজে রোহানকে আটকে রাখা হত । বিষয়টি সকল বন্ধুরা অবগত তার।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, কক্সবাজার শহরে শাহ আলম ওরফে রোহানের একটি ইয়াবা সিন্ডিকেটের গ্রুপ রয়েছে। যাদের মাধ্যমে রোহান ইয়াবা ট্যাবলেট পাচার করে। ওই সিন্ডিকেটে তানিয়া ও রিমি নামে দুইজন তরুণী রয়েছে। তানিয়া কক্সবাজার শহরের ঘোনা পাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন এক সময়। তানিয়ার আন্ডারে কাজ করত আরো ৪ থেকে ৫ জন মহিলা। এরমধ্যে একজন রিমি। রিমি টেকনাফ শাপলাপুর এলাকার বাসিন্দা। কক্সবাজার শহরে থাকত। যারা নিয়মিত রোহানের ইয়াবা সিন্ডিকেটে জড়িত ছিল। এমনকি রোহানের ক্রেডিট কার্ড হিসেবে ছিল রিমি।

এদিকে রোহানের ইয়াবা পাচার সিন্ডিকেটে রয়েছে দক্ষিণ রুমালিয়ারছড়া ৭নং ওয়ার্ড এলাকার মো. রশিদের ছেলে তৌহিদুল হাসান (বর্তমানে গ্রেফতার), তারাবনিয়ারছড়া এলাকার সাকিব, বৈদ্যঘোনা এলাকার ফাহিম, রামুর একজন ভাইস চেয়ারম্যানের ছেলে ইয়ামাম, বার্মিজ মার্কেট এলাকার বাবু, মহেশখালীর ছেলে তৌহিদ।
যে তৌহিদ একসময় বাজারঘাটা ওয়াল্টন শো-রুমে চাকরি করত। রোহানের ইয়াবা পাচারে জড়িত হয়ে চাকরি ছেড়ে দেয়। রয়েছে লাইট হাউজ এলাকার বাবু। এই সিন্ডিকেটের বেশির ভাগ আড্ডা ছিল শহরের বার্মিজ মার্কেটস্থ বাঙ্গালি বাবুর পশ্চিমে শফির পানের দোকানের সামনে। ওই পানের দোকানে রোহান ইয়াবা মজুত ও লেনদেন করে বলে জানা গেছে।
তবে একটি সূত্রে বলছে, রোহানের প্রচুর মেয়ে বান্ধবী রয়েছে। মেয়ের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল বেশি। যার কারণে অনেক কলেজের ছোট ছেলেদের পিছনে অর্থ ব্যয় করে মেয়ে বান্ধবীর জন্য। যাদের পিছনে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা খরচ করে। নামি-দামি রেস্টুরেন্টে বিল পরিশোধ করে। তার এই সিন্ডিকেটে সবাই কলেজ ছাত্র। কিন্তু তাদের রয়েছে নামি-দামি বাইক। চলাফেরা আলিশান। কলেজ ছাত্রের কোটিপতি স্টাইলে জীবন-যাপন।

এদিকে শাহ আলম রোহান ইয়াবাসহ গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়ছে তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যায়। এমনকি অনেকেই নিজের ফেইসবুক আইডি থেকে রোহান, রিমন ও তৌহিদের সাথে থাকা ছবিও ডিলেট করে দেন।