• বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম
চকরিয়ায় ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যা : ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিলেন ‘কালু ড্রাইভার’ কর্মস্থল কক্সবাজার : প্রজেক্ট ম্যানেজার পদে নিয়োগ দেবে সেভ দ্য চিলড্রেন কক্সবাজারসহ ৫ জেলায় ভারি বৃষ্টি ও ভূমিধসের আশঙ্কা ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যাকান্ডে দুই নারীসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা সাগরে ভাসতে থাকা ১৩ জেলেকে উদ্ধার করল কোস্টগার্ড চকরিয়া ছাত্রদল নেতা জিসান হত্যা : হুমকির অডিও ঘিরে চাঞ্চল্য কক্সবাজারকে সাজালে বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতি কক্সবাজার ভ্রমণে যাওয়ার পথে সীতাকুন্ডে দুর্ঘটনায় একজন নিহত আসছে টানা ৭ দিন ছুটির সুযোগ জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানের বায়োতে যা লেখা হয়েছে

সরগরম ‘ইয়াবা গ্রাম’ লারপাড়া

নিজস্ব প্রতিদেক / ২১১৯ বার ভিউ
আপডেট সময় : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আজিম নিহাদ ও আরফাতুল মজিদ:

কক্সবাজার বাস টার্মিনালস্থ লারপাড়া এলাকা মাদকের ডিপোতে পরিণত হয়েছে বহু বছর আগে। তবে মাদক কারবারিরা রয়েছে এখনো অধরা। বিভিন্ন কারণে বেশ কয়েকজন ইয়াবা ডন আত্মগোপনে থাকলেও বর্তমানে তারা আবার এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরছে। অনেকেই প্রশাসনের সোর্স পরিচয় দিয়ে দিনরাত ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাস টার্মিনালস্থ লারপাড়া এলাকায় ইয়াবা কারবারে শীর্ষ মুসা আলীর ছেলে আব্দুল গণি। আব্দুল গণি লারপাড়া এলাকায় একজন চিহ্নিত ইয়াবা কারবারি বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তবে প্রশাসনের ঝামেলা এড়াতে নিজ ঘরে অবস্থান করে না ইয়াবা গণি। গভীররাত পর্যন্ত ওই এলাকায় বিচরণ রয়েছে গণির। আরেক মাদক কারবারি টুকাই কবিরের নাম সবার জানা রয়েছে। টুকাই কবির বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে ইয়াবা কারবার চালিয়ে যায়।

লারপাড়া এলাকায় যে কয়েকজন মাদকের কারবার শুরু করেছিল তারমধ্যে টুকাই কবির অন্যতম। ইয়াবা ব্যবসার আড়ালে বেশ কয়েকটি আলিশান বাড়ি, নামে বেনামে গাড়ি ও জমি রয়েছে কবিরের। রয়েছে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে বাসও। এসব অবৈধ আয় বর্তমানে বৈধ করার পায়তারাও চালিয়ে যাচ্ছে কবির। অধিকাংশ এসব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে কবিরের ভাই কোরবান আলী ও তার সক্রিয় সিন্ডিকেটের সদস্যরা। গ্রেপ্তার এড়াতে বেশির ভাগ সময় কবির এলাকার বাইরে থাকলেও কবিরের হয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে কোরবান আলী।

বাস টার্মিনাল এলাকার আলোচিত আরেক মাফিয়ার নাম লাল মিয়া। লাল মিয়া পুরো বাস টার্মিনাল এলাকার আতঙ্ক। দালালি থেকে শুরু করে পুরো মাদক কারবারে রয়েছে লাল মিয়ার বিশাল সিন্ডিকেট। বাবার হাত ধরে মাদকে জড়িয়ে যায় লাল মিয়ার ছেলে আবুল কালাম ও আবুল বশর। বর্তমানে কালাম ও বশর ইয়াবা কারবারে আলোচিত নাম। তবে গত এক বছর ধরে আত্মগোপনে থাকলেও সম্প্রতি এলাকায় ফিরেছে আবুল কালাম। এরমধ্যে আবুল বশর ও তার বাবা লাল মিয়া দীর্ঘদিন কারাভোগ করে বের হয়।

মাদকের ঘটনায় তারা দুজন কারাগারে ছিলেন। কারাগার থেকে বের হয়ে ফের ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়ে লাল মিয়া ও তার ছেলে আবুল বশর। পানিসহ বিভিন্ন ডিলারের আড়ালে বশর মাদক কারবারে জড়িত রয়েছে বলেও পুলিশের একটি সূত্রে জানা গেছে। লাল মিয়ার নাম রয়েছে থানার দালালিতে নাম্বার ওয়ানে। বাস টার্মিনালে বসেই দালালির কাজ সারেন লাল মিয়া।

প্রশাসনের তালিকাভুক্ত এয়ার মোহাম্মদও বর্তমান সময়ে ইয়াবা কারবারে বেপরোয়া। আলোচিত কয়েকজনের মধ্যে ইয়ার মোহাম্মদ অন্যতম কক্সবাজার শহরে। এয়ার মোহাম্মদের বিষয়টি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকটি ইউনিটও অবগত রয়েছে।

বর্তমানে বাসটার্মিনালসহ আশ পাশের পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে ইয়ার মোহাম্মদের দুই জেলে মিজান ও আজিম। অনেক সময় তারা প্রশাসনের সোর্স পরিচয় দিয়ে এলাকায় দাপিয়ে বেড়ায়। এরমধ্যে র‌্যাবের সোর্স পরিচয় দিয়ে নিজেকে আড়াল করে আজিম। আজিমের মাদক কারবারের বিষয়টি পুরো এলাকাবাসীরা অবগত রয়েছে। তিনি নিজেকে সোর্স পরিচয় দিয়ে ইয়াবা লুটের ঘটনাও ঘটিয়েছে বেশ কয়েকটি।

এছাড়া পশ্চিম লারপাড়া এলাকার আলোচিত ইয়াবা কারবারি ইমাম হোসেন। তবে আত্মসমর্পন করে কারাগারে রয়েছে ইমাম হোসেন। ইমাম হোসেন কারাগারে থাকলেও তার সক্রিয় সদস্যরা এখনো মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। এরমধ্যে রয়েছে পশ্চিম লারপাড়ার মোহাম্মদ নবী, আব্দুল্লাহ, মারওয়ান, মোজাম্মেল ও ভাড়াটি শামসু। তারা সবাই ইমাম হোসেনের সক্রিয় মাদক কারবারির পার্টনার।

একই এলাকায় মাদকের রাজত্ব চালাচ্ছে শাহাজান, শাহআলম, ও শাহাজালাল। তারা তিনজনেই আপন ভাই। তবে প্রতিজনের মাদক ব্যবসা ও সিন্ডিকেট আলাদা। যে যার মতো করে মাদক জগতে আজ প্রতিষ্ঠিত। এলাকায় রয়েছে তাদের মাদকের বেশ নাম ডাকও। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে টপ লিস্টে রয়েছে মেম্বারের ভাই আবু তালেবের ছেলে মুছা। মুছা বর্তমানে আত্মগোপনে। আত্মগোপনে থাকলেও তার মাদক ব্যবসা থেমে নেই। মুছার হয়ে মাদকের লেনদেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন তার আপন ছোট ভাই। মাদক কারবার আড়াল করার জন্য বাসটার্মিনাল এলাকায় কয়েকটি দোকান খুলেছেন তিনি।

লারপাড়ার পাশেই ইসলামাবাদে রয়েছে আরেক মাদকের হাট। অনেক মাফিয়ার আস্তানা রয়েছে ইসলাবাদে। ওই এলাকার অন্যতম মাফিয়া আবুল কালাম ওরফে বড় দা। কিশোর গ্যাং লিডার হিসেবে প্রশাসনের তালিকায় বড় দা রয়েছে শীর্ষে। তার সক্রিয় সদস্য হলো জাবেদ হোসেন, সজিব ও বেলাল। তাদের মাধ্যমে ইয়াবা কারবার নিয়ন্ত্রণ করে বড় দা। বর্তমানে বড় দা আত্মগোপনে থাকলেও সক্রিয় রয়েছে জাবেদ, সজিব ও বেলাল।

লারপাড়ার শহিদ ও বোরহান, পশ্চিম লারপাড়ার সৈয়দ আকবর, বাসটার্মিনালের নাইটগার্ড নজির আহমদের ছেলে মনু ওরফে বাইট্টা মনু, মৃত মোজাফ্ফরের ছেলে চানমিয়া, নুর মোস্তফা, মোস্তাক আহমেদ ওরফে মনুসহ দুই ডজন ইয়াবা কারবারি এখন দেদারছে চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা ব্যবসা।

ইয়াবা ব্যবসায়ী সৈয়দ আকবরের বাড়ি উত্তর লারপাড়া শশ্মান সংলগ্ন এলাকায়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসা করে আসছেন। তার বাড়িতে প্রতিনিয়ত ইয়াবা সেবনের আসরও বসে। তার পক্ষে ইয়াবা পাচার করে তাঁর স্ত্রী। তিনি ইয়াবা নিয়ে পুলিশের হাতে অন্তত ২০ বার গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু তারপরও ইয়াবা ব্যবসা থেমে নেই।

অনুসন্ধানে সৈয়দ আকবরের সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্যের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন রনি, আজিজুর রহমান, জয়নাল আবেদিন, জুবাইর, হোটেল ব্যবসায়ী রনি, আল আমিন, জিয়া, সোহেল, রিয়াজ উদ্দিন, খুরুশকুল এলাকার সৈয়দ আকবরের এক আত্মীয়, নুরু, ড্রাইভার আজিজুর রহমান, ঢাকার জনৈক মিরাজ, আব্দুচ সালাম। এরা সকলেই সৈয়দ আকবরের কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করেন। এছাড়াও তাঁর হয়ে নিয়মিত পাচার কাজ করেন মিন্টু, বোরহান এবং সৈয়দ আকবরের স্ত্রী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লারপাড়া এলাকার মানুষের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম ছিল খুবই নিম্ন শ্রেণীর কাজকর্ম। কিন্তু বর্তমান সময়ে মাদকের আখড়া হিসেবে পরিনত হয়েছে। রাতের আধারে সীমান্ত শহর টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে সারাদেশে পাচারের মাধ্যমে রাতারাতি কোটিপতি বনে যায় লারপাড়া এলাকার অনেক বাসিন্দা। প্রশাসনের চোখ ফাকি দিয়ে এবং তাদের নাম ব্যবহার করে কথিত সোর্স বলে এলাকায় মাদকের রাম রাজত্ব গড়ে তুলেছে এসব মাদক কারবারিরা। এক পরিবারের অনেকেই জড়িত রয়েছে অবৈধ মাদক ব্যবসায়। যা রীতিমত চোখে পড়ার মতই। অনেক চিহ্নিত মাদক কারবারি নিজের স্ত্রী ও বোনদের মাদক পাচারে নিরাপদ হিসেবে ব্যবহার করে যাচ্ছে।

কক্সবাজার বাসটার্মিনালের পাশে হওয়ায় এই এলাকার বেশির ভাগ মানুষের মাদক ব্যবসা করা সহজ ও সুবিধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যে সকল চালক গাড়ি নিয়ে আসেন তারা অনেকেই আশ্রয় নেন লারপাড়ায়। ভাড়াবাড়ি নিয়ে চালিয়ে যান ইয়াবার কারবার।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে অবৈধ টাকাকে বৈধ করার জন্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে এবং দেশের ভিতরে স্থান পরিবর্তন করে বসবাস করে যাচ্ছে। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই জেলের ভিতরে থাকলেও তাদের সিন্ডিকেট বা আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে পরিচালনা করছে মাদক ব্যবসা।

লারপাড়া সচেতন নাগরিকরা মনে করছে, মাদকের আখড়া হিসেবে এই এলাকার যে দূর্নাম ছড়িয়ে পড়েছে তার থেকে রেহাই পেতে অনেক কষ্ট হবে। হয়ত এই দুর্নাম কোনো দিনও শেষ হবে না। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযানে যদি এসব চিহ্নিত ইয়াবা কারবারিদের আইনের আওতায় আনা হয় হয়ত কিছুটা কমবে দুর্নাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন