মোহাম্মদ ফরিদ:
টানা ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। চলমান এই নিষিদ্ধ সময়ের ৪২ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। শেষ হতে আরও ২৩ দিন বাকি। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জেলেরা সম্পূর্ণভাবে বেকার হয়ে আছে।
পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অভাবের মধ্যে দিনাতিপাত করছে জেলেরা। অনাহারে-অর্ধাহারে কাটছে তাদের দিন। এমন দুঃসময়ে কেউ তাদের খবর নিচ্ছে না। জেলে পল্লীতে বিরাজ করছে নিরব দুর্ভিক্ষ। জেলে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরের মাছের প্রজনন রক্ষায় টানা ৬৫ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। গত ২০ মে থেকে এই নিষিদ্ধ সময় শুরু হয়। শেষ হবে আগামী ২৩ জুলাই। মাছ ধরা নিষিদ্ধ করার পর মৎস আহরণ পেশার উপর নির্ভরশীল কক্সবাজারের লক্ষাধিক জেলে সম্পূর্ণ বেকার হয়ে গেছে।
নিষিদ্ধ সময়ে নিবন্ধিত প্রায় সাড়ে ৪৬ হাজার জেলে সরকারি অনুদান হিসেবে পেয়েছে মাত্র ৪০ কেজি চাল। সাথে স্বল্প পরিমাণ অন্যান্য সরঞ্জাম। অন্যদিকে আরও অর্ধলক্ষাধিক জেলে পায়নি অনুদান। সাড়ে ৪৬ হাজার জেলেকে যে পরিমাণ চাল ও সরঞ্জাম পেয়েছে তা একটি জেলে পরিবারের মাত্র কয়েকদিনের খাদ্য। অভিযোগ রয়েছে অনেক স্থানে প্রকৃত জেলেরা সহায়তা পায়নি।
জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার সদর ও টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকার লক্ষাধিক মানুষ জেলে পেশার সাথে জড়িত। মাছ ধরে চলে তাদের পুরো সংসার। টানা ৬৫ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে অর্থাভাবে তাদের পরিবারের দিন কাটছে চরম কষ্টে।
কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলায় লক্ষাধিক জেলে থাকলেও নিবন্ধিত হয়েছে ৪৮ হাজার ৩৯৩ জন।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাছ ধরা বন্ধের সময়ে জেলেদের খাদ্যশস্য সহায়তা দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে কক্সবাজার জেলায় ১ হাজার ৮৪৩ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
১ হাজার ৮৪৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্যের উপকারভোগী নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬ হাজার ৮৭ জন জেলে পরিবার। প্রতি পরিবারে ৪০ কেজি করে বিতরণ করা হয়েছে। তারমধ্যে সদর উপজেলায় ৭ হাজার ৯৫ জন, চকরিয়ায় ৩ হাজার ৮৪৯ জন, মহেশখালীতে ১১ হাজার ৪২২ জন, উখিয়ায় ৩ হাজার ৩৯৯ জন, পেকুয়ায় ৩ হাজার ৯৪৯ জন, কুতুবদিয়ায় ৮ হাজার ৫১৩ জন ও টেকনাফে ৭ হাজার ৮৬০ জন জেলে পরিবার। নিবন্ধন না থাকায় বাকি অধিকাংশ জেলে অনুদান পায়নি।
কক্সবাজার পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের জেলে নেজাম উদ্দিন জানান, তিনি কিশোর বয়স থেকে জেলে পেশার সাথে জড়িত। তার সাত সদস্যের পরিবারে তিনি একমাত্র উপার্জনকারী। করোনা মহামারি আর ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞায় তার পরিবার চলছে চরম কষ্টে। সরকারি-বেসরকারি কোন রকম সাহায্য পাননি তিনি। জেলে কার্ডের আবেদন করেও কপালে জুটেনি।
মাঝেরঘাট এলাকার জেলে জাফর আলম জানান, দীর্ঘদিন দিন ধরে তিনি জেলে পেশার সাথে জড়িত। পরিবারের একমাত্র ভরসা তিনিই। ৬৫দিনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ হওয়াতে তার পরিবারে দুর্দিন নেমে এসেছে। খেয়ে না খেয়ে ৪৫ দিন অতিবাহিত করেছেন। আরও ২৩ দিনের মতো বাকি আছে। কিভাবে পরিবারের খাবার জোগাড় হবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।
জানা যায়, কক্সবাজার পৌরসভার ১নং, ২নং, ৪নং, ৫নং ওয়ার্ডের ৪০ শতাংশ মানুষ মৎস্য পেশার সাথে জড়িত। তারা পারিবারিকভাবে এই পেশার সাথে জড়িয়ে যায়। অভিজ্ঞতা না থাকায় অন্য কোন পেশায় যাওয়াও তাদের জন্য দুস্কর। তাই সাগরে যাওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।
কক্সবাজার পৌরসভার সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর শাহেনা আক্তার পাখি জানান, কুতুবদিয়া ও মহেশখালীসহ বিভিন্ন এলাকার জেলেরা এসে কক্সবাজার পৌরসভার ১নং এবং ২নং ওয়ার্ডে বসবাস করছেন। এই দুই এলাকা জেলে পল্লী হিসেবে সমাদৃত। মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হলে সবাই বেকার হয়ে পড়ে। এতে অর্থাভাবে নিরবেই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে তাদের।
মোহাম্মদ আরজু নামে এক জেলের অভিযোগ, মৎস্য পেশায় জড়িত নেই এমন ব্যক্তি সরকারের সহায়তা কার্ড পেয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে রিকসা চালক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার লোক।
এদিকে নিবন্ধিত জেলেরা বলছে, তারা ৪০ কেজি করে চাল পেয়েছে। তবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম খালেকুজ্জামান বলেন, জেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ৪৮ হাজার ৩৯৩ জন। তাদের প্রত্যেককে ৫৬ কেজি করে চাল দেয়া দেয়া হয়েছে। বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা শেষ হতে ২৩ দিন বাকি। বাকি সময়ে আরও সহায়তা দেয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন অর্থবছরে বাদপড়া জেলেদের নিবন্ধন করতে কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে কিছু জেলের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তালিকা সম্পূর্ণ হলে তারাও সব ধরণের সুযোগ সুবিধা পাবে।