• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৬ পূর্বাহ্ন

কক্সবাজারকে সাজালে বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতি

ভয়েস ওয়ার্ল্ড ডেস্ক : / ৭ বার ভিউ
আপডেট সময় : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সমুদ্রের কাছে গেলে মানুষের মন বড় হয়ে যায়। দিগন্তজোড়া নীল জলরাশি, ঢেউয়ের অবিরাম ছুটে চলা, বালুকাবেলার বিস্তৃতি আর সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য মানুষকে টেনে নেয় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। বিশ্বের বহু দেশ তাদের সমুদ্রসৈকতকে শুধু প্রকৃতির দান হিসেবে রেখে দেয়নি, তাকে অর্থনীতির শক্তিতে পরিণত করেছে। কোথাও সমুদ্রসৈকতের পাশে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী, কোথাও তৈরি হয়েছে নিরাপদ বিচ জোন, কোথাও হয়েছে ওয়াটার স্পোর্টস, মেরিন ড্রাইভ, শপিং, বিনোদন, রেস্টুরেন্ট, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও বিলাসবহুল আবাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা। মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশও সমুদ্রকে পর্যটন অর্থনীতির বড় সম্পদে পরিণত করেছে।

আমি নিজেও বিভিন্ন দেশের সমুদ্রসৈকতে গিয়েছি। অনেক জায়গায় কক্সবাজারের মতো প্রাকৃতিক বিস্ময় নেই, অথচ পরিকল্পনা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার কারণে সেই সৈকতগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, কক্সবাজারের মতো অসাধারণ প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরও আমরা কেন সেই সম্পদের পূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারছি না?

বাংলাদেশ পর্যটনের দেশ হতে পারে। শুধু কক্সবাজার নয়, বান্দরবানের পাহাড়, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, সেন্ট মার্টিনের নীল জল, পতেঙ্গা, কুয়াকাটা, রাতারগুল, হাওর অঞ্চল, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, নদী ও গ্রামীণ প্রকৃতি মিলিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদের বৈচিত্র্য অসাধারণ। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক নথিতেও বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলরেখা, কক্সবাজার ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলকে নীল অর্থনীতি, ইকো-ট্যুরিজম ও পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা আর বাস্তব অর্থনৈতিক সাফল্য এক জিনিস নয়। সম্ভাবনাকে শিল্পে পরিণত করতে হয়। পর্যটনও তার ব্যতিক্রম নয়।

কক্সবাজারকে তাই শুধু একটি সমুদ্রসৈকত হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে দেখতে হবে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক পর্যটন অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে। সুখের কথা হলো, কক্সবাজার বিমানবন্দর ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর থেকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা কার্যকর করার কথা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। সেখানে কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, স্বাস্থ্য ও কোয়ারেন্টিন সুবিধার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণা করলেই আন্তর্জাতিক পর্যটন আসে না। প্রয়োজন নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, প্রতিযোগিতামূলক বিমানভাড়া, ভিসা ও ইমিগ্রেশন সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনাল, নিরাপত্তা, বহুভাষিক সেবা, মানসম্মত পরিবহন এবং বিদেশি পর্যটকের জন্য সহজ ও নির্ভরযোগ্য পুরো ভ্রমণব্যবস্থা। কক্সবাজার বিমানবন্দরকে পর্যটন জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে বেবিচকের পরিকল্পনাও রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই পরিকল্পনাকে দ্রুত, সমন্বিত ও বাস্তবমুখী করা।

আমি মনে করি কক্সবাজারে একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক পর্যটন জোনের কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা যেতে পারে। পুরো সৈকত সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ বিনা মূল্যে সমুদ্র উপভোগ করবে, পরিবার নিয়ে যাবে, শিশুরা খেলবে, তরুণরা আনন্দ করবে। এটি তাদের অধিকার। কিন্তু এর পাশাপাশি নির্দিষ্ট একটি এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি নিয়ন্ত্রিত বিচ জোন গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে প্রবেশের জন্য নির্ধারিত টিকিট বা ডে-পাস থাকতে পারে। দেশি পর্যটকের জন্য এক ধরনের ফি এবং বিদেশি পর্যটকের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যটন প্যাকেজ থাকতে পারে। প্রবেশমূল্য তিন হাজার বা পাঁচ হাজার টাকা হবে কি না, সেটি গবেষণা করে নির্ধারণ করা যেতে পারে। মূল বিষয় টাকা নেওয়া নয়, মূল বিষয় হলো একটি নির্দিষ্ট জোনে বিশ্বমানের সেবা তৈরি করা। সেখানে থাকবে পরিচ্ছন্ন সৈকত, নিরাপদ সাঁতার এলাকা, লাইফগার্ড, আধুনিক ওয়াশরুম, লকার, পরিবর্তনকক্ষ, মানসম্মত খাবার, শিশুদের বিনোদন, ওয়াটার স্পোর্টস, বিচ চেয়ার, সানশেড, চিকিৎসা ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা। বিদেশি পর্যটক সেখানে যে অর্থ ব্যয় করবেন, তার বড় অংশই দেশের অর্থনীতিতে ফিরে আসবে।

এমন একটি জোনকে আমরা ‘ফরেন ট্যুরিস্ট জোন’ বলতে পারি। তবে নামের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে এর মান ও ব্যবস্থাপনা। এটি কোনোভাবেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য বৈষম্যমূলক দেয়াল তৈরি করবে না। বরং একই সৈকতের একদিকে থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত জনবান্ধব সৈকত, অন্যদিকে থাকবে অর্থপ্রদানের মাধ্যমে উন্নত সেবা গ্রহণের সুযোগ। পৃথিবীর বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে এ ধরনের মডেল দেখা যায়। বাংলাদেশেও গবেষণা, জনমত, পরিবেশগত সমীক্ষা ও স্বচ্ছ নীতিমালার ভিত্তিতে এমন একটি মডেল তৈরি করা যেতে পারে।

কক্সবাজারে শুধু সৈকত থাকলেই হবে না, সৈকতকে ঘিরে একটি পর্যটন অর্থনীতি তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, বুটিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সি-ফুড মার্কেট, স্থানীয় হস্তশিল্পের বাজার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাতের বিনোদন, নিরাপদ ওয়াকওয়ে, সাইকেল ট্র্যাক, মেরিন ড্রাইভের নির্দিষ্ট পর্যটন স্টপেজ, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, ডিজিটাল গাইড, বহুভাষিক সাইনবোর্ড এবং প্রশিক্ষিত পর্যটনকর্মী দরকার। বিদেশি পর্যটক যেন বিমানবন্দর থেকে হোটেল, হোটেল থেকে সৈকত এবং সৈকত থেকে অন্যান্য পর্যটন স্পটে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সংগঠিত পরিবেশ পান। একজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এসে যেন মনে না করেন তিনি একটি অসংগঠিত জায়গায় এসেছেন; বরং যেন মনে করেন তিনি একটি পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যে এসেছেন।

এর সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিরাপত্তা। পর্যটন শিল্পের প্রাণ হচ্ছে নিরাপত্তা। পর্যটকের মনে যদি নিরাপত্তাহীনতা থাকে, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর সৈকতও পর্যটক টানতে পারবে না। সৈকতে পর্যটন পুলিশ, লাইফগার্ড, সিসিটিভি, জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র, উদ্ধারকারী দল, নির্দিষ্ট সাঁতার এলাকা, সমুদ্রের বিপদসংকেত, নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র এবং ২৪ ঘণ্টার জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা থাকা দরকার। নিরাপত্তা শুধু পর্যটকের জন্য নয়, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের জন্যও হতে হবে।

আমাদের দেশে অনেক সময় দেখা যায়, একটি উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হলো, তারপর বছরের পর বছর নানা জটিলতায় সেটি আটকে থাকল। পরিবেশের বিষয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পরিবেশগত মূল্যায়ন যেন উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়ার স্থায়ী কারণ না হয়। পরিবেশগত ঝুঁকি থাকলে সমাধানের পথ বের করতে হবে। প্রয়োজন হলে নকশা পরিবর্তন করতে হবে, গাছ অন্যত্র লাগাতে হবে, নির্মাণের ধরন বদলাতে হবে, পর্যটকের সংখ্যা সীমিত করতে হবে, প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করতে হবে, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু শুধু ‘পরিবেশের ক্ষতি হবে’ বলে প্রকল্প থামিয়ে দিলে চলবে না। পরিবেশও বাঁচাতে হবে, অর্থনীতিও এগিয়ে নিতে হবে।

এখানেই আমাদের পরিবেশবিদদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেই আন্দোলনের সঙ্গে দেশের অর্থনীতির প্রশ্নটিও যুক্ত হতে হবে। কত মানুষ কর্মসংস্থান পাবে, কত বৈদেশিক মুদ্রা আসবে, স্থানীয় জনগোষ্ঠী কতটা লাভবান হবে, দেশের পর্যটন ব্র্যান্ড কতটা শক্তিশালী হবে, এসবও পরিবেশগত সিদ্ধান্তের আলোচনায় আসতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নয়, পাশাপাশি রেখে সমাধান খুঁজতে হবে। কারণ শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ সংরক্ষণও কঠিন। আবার ধ্বংসপ্রাপ্ত পরিবেশের ওপর টেকসই অর্থনীতিও গড়ে ওঠে না।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে পরিবেশও থাকবে, পর্যটনও থাকবে, অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। আমরা চাই কক্সবাজারের সমুদ্র যেমন থাকবে, তেমনি সমুদ্রকে ঘিরে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানও হবে। আমরা চাই গাছ থাকবে, কিন্তু সেই গাছের আড়ালে পর্যটকের চোখ থেকে সমুদ্র হারিয়ে যাবে না। আমরা চাই সৈকত থাকবে, কিন্তু সৈকতে বিশৃঙ্খলা থাকবে না।

পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটন উন্নয়নকে পরস্পরের শত্রু বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। বরং পরিবেশবান্ধব পর্যটনই হতে পারে আমাদের ভবিষ্যৎ পথ। বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের স্মার্ট ডেল্টা সিটি ধারণাতেও পরিবেশ, নিরাপত্তা, চলাচল, অবকাঠামো ও পর্যটনকে সমন্বিতভাবে দেখার কথা বলা হয়েছে। আমাদেরও সেই সমন্বিত চিন্তায় যেতে হবে। যেখানে একটি গাছ সরানোর প্রয়োজন হবে, সেখানে প্রশ্ন হবে তার পরিবেশগত মূল্য কী এবং তার বিকল্প কোথায়। কোথাও বালিয়াড়ি রক্ষা করতে হবে, কোথাও জলাভূমি রক্ষা করতে হবে, আবার কোথাও পর্যটকের জন্য নিরাপদ হাঁটার পথ তৈরি করতে হবে। সব সিদ্ধান্তই হতে হবে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ভিত্তিতে।

পর্যটন উন্নয়নের আরেকটি বড় শক্তি হতে পারে স্থানীয় মানুষ। কক্সবাজারের মানুষ শুধু পর্যটকের কাছে দোকানদার বা পরিবহনকর্মী হয়ে থাকবে কেন? তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ট্যুর গাইড, লাইফগার্ড, শেফ, হোটেলকর্মী, ট্রাভেল অপারেটর, নৌযান পরিচালনাকারী, হস্তশিল্প উদ্যোক্তা এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনার অংশীদার করা যায়। এতে পর্যটন থেকে আয় স্থানীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে। একজন বিদেশি পর্যটক একটি হোটেলে টাকা খরচ করবেন, রেস্টুরেন্টে খাবেন, স্থানীয় পণ্য কিনবেন, পরিবহন ব্যবহার করবেন, গাইড নেবেন। অর্থাৎ একটি পর্যটক আসলে একটি ছোট অর্থনৈতিক চেইন তৈরি করেন।

আরেকটি বিষয় আমাদের ভাবতে হবে। কক্সবাজারে শুধু পর্যটক আনলেই হবে না, তাকে কয়েক দিন ধরে রাখতে হবে। তিন দিনের প্যাকেজ, পাঁচ দিনের প্যাকেজ, পরিবারভিত্তিক প্যাকেজ, অ্যাডভেঞ্চার প্যাকেজ, ইকো-ট্যুরিজম প্যাকেজ, কনভেনশন ও কনফারেন্স ট্যুরিজম, ওয়েলনেস ট্যুরিজম, সামুদ্রিক খাবার ও স্থানীয় সংস্কৃতিভিত্তিক প্যাকেজ তৈরি করা যেতে পারে। কক্সবাজার থেকে বান্দরবান, সুন্দরবন বা চট্টগ্রামের অন্যান্য আকর্ষণীয় স্থানে সমন্বিত ট্যুর প্যাকেজ তৈরি হলে একজন বিদেশি পর্যটক শুধু কক্সবাজারে এসে ফিরে যাবেন না, বাংলাদেশে আরও কয়েক দিন থাকবেন। তার ব্যয় বাড়বে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও বাড়বে।

রাষ্ট্রকে তাই কক্সবাজারকে শুধু পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে অর্থনীতি, বেসামরিক বিমান চলাচল, স্বরাষ্ট্র, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, সড়ক ও যোগাযোগ, সংস্কৃতি এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত জাতীয় প্রকল্প হিসেবে দেখতে হবে। সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বচ্ছ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে, কিন্তু সৈকত, বালিয়াড়ি, পরিবেশ ও জনস্বার্থের মালিকানা রাষ্ট্রের কাছেই থাকবে। পর্যটন উন্নয়নের নামে যেন অপরিকল্পিত দখলদারিত্ব বা অবকাঠামোগত বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সে জন্য শক্তিশালী মাস্টারপ্ল্যান ও স্বাধীন তদারকি প্রয়োজন।

কক্সবাজার নিয়ে আমাদের মানসিকতাও বদলাতে হবে। শুধু ঈদের ছুটিতে লাখো মানুষের ভিড় আর হোটেল ব্যবসা দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্প হয় না। আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্প মানে সারা বছর পর্যটক, সারা বছর কর্মসংস্থান, সারা বছর বৈদেশিক মুদ্রা আয়। এ শিল্পে বিমানবন্দর থেকে সৈকত, হোটেল থেকে রেস্টুরেন্ট, নিরাপত্তা থেকে পরিবেশ, বিনোদন থেকে সংস্কৃতি, সবকিছুকে একটি সুতোয় বাঁধতে হয়।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা বিশাল। সরকারি নথিতেও টেকসই পর্যটন উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক প্রচার, পর্যটন অবকাঠামো আধুনিকীকরণ এবং কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পর্যটনসংশ্লিষ্ট সুবিধা উন্নয়নের কথা রয়েছে।  এখন প্রয়োজন পরিকল্পনাগুলোকে কাগজ থেকে বাস্তবে নিয়ে আসা।

কক্সবাজারের সমুদ্র আমাদের। এই সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করার অধিকারও এ দেশের মানুষের। তাই সাধারণ মানুষের জন্য সৈকত উন্মুক্ত থাকুক। পাশাপাশি একটি বা একাধিক আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ পর্যটন জোন তৈরি হোক, যেখানে দেশি-বিদেশি পর্যটক অর্থের বিনিময়ে উন্নত সেবা গ্রহণ করবেন। সেই আয় দিয়ে সৈকতের পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের উন্নয়ন করা যেতে পারে। বিদেশি পর্যটক ডলার খরচ করবেন, বাংলাদেশি পর্যটক টাকা খরচ করবেন, কিন্তু উভয়ের ব্যয়ই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাহিত হবে।

কক্সবাজারকে যদি আমরা শুধু বেড়ানোর জায়গা হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা এর সৌন্দর্য দেখব। কিন্তু যদি একে জাতীয় অর্থনীতির সম্পদ হিসেবে দেখি, তাহলে এর সম্ভাবনা দেখতে পাব। বিশ্বের অনেক দেশ তাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে পর্যটন অর্থনীতিতে রূপান্তর করে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও পারবে। তবে তার জন্য দরকার সাহসী সিদ্ধান্ত, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি পর্যটনকে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে দেখার মানসিকতা।

কক্সবাজারকে বদলানোর সময় এখনই। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণার পরবর্তী ধাপ হতে হবে আন্তর্জাতিক পর্যটন সংযোগ। সমুদ্রসৈকতের পরবর্তী ধাপ হতে হবে বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা। পরিবেশ রক্ষার পরবর্তী ধাপ হতে হবে পরিবেশবান্ধব পর্যটন। আর পর্যটনের পরবর্তী ধাপ হতে হবে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার।
কক্সবাজারের ঢেউ প্রতিদিন আমাদের ডাকছে। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই ডাক শুনব কখন? প্রকৃতি আমাদের যে সম্পদ দিয়েছে, সেটিকে অবহেলায় ফেলে রাখব, নাকি জ্ঞান, পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাকে দেশের অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করব? কক্সবাজার শুধু বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত সমুদ্রসৈকত নয়, সঠিক পরিকল্পনা হলে এটি হতে পারে বাংলাদেশের বিশ্ব পর্যটনের প্রবেশদ্বার এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম নতুন দুয়ার।

মীর আব্দুল আলীম
মহাসচিব -কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ। সূত্র-ঢাকাপোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ পড়ুন