বিশেষ প্রতিবেদক
চলতি বছরের গত ২৬ নভেম্বর রাজধানীর দারুস সালাম থানা এলাকা থেকে ১০ হাজার ইয়াবাসহ মাইনুদ্দিন ওরফে মায়েনকে আটক করেছে ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগ। মায়েন কক্সবাজার কলাতলীস্থ দরিয়ানগর বড়ছড়া এলাকার কাশেম সওদাগরের ছেলে। ইয়াবাসহ মায়েন আটক হলেও তার সহযোগিরা রয়েছে অধরা। এমনকি তার সহযোগি অনেকেই রহস্যজনক। মায়েনের একটি বড় সিন্ডিকেট রয়েছে দরিয়ানগর বড়ছড়া এলাকায়। একই সাথে একজন নারী গডফাদার রয়েছে ঢাকায়। যে নিয়মিত কক্সবাজার আসা-যাওয়া করত। প্রায় সময় মায়েন ও তার সিন্ডিকেটরা ঢাকায় গিয়ে ইয়াবা পৌঁছে দিত ওই নারীর কাছে। একটি সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে মায়েন ইয়াবাসহ আটক হওয়ার পর কৌশলে আত্মগোপনে রয়েছে বড়ছড়া কেন্দ্রিক ইয়াবা কারবারিরা। কয়েকজন চুপ থাকলেও অনেকেই এলাকা ছাড়াও হয়েছে। এমনকি দৃশ্যমান আয়ের কিছু না থাকলেও মায়েনের সহযোগিদের চলাফেরা আলিশান। অদৃশ্য আয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছে অনেকেই। অল্প বয়সী এসব ইয়াবা সিন্ডিকেটের সদস্যরা বড়ছড়া সমাজে আলোচনায় রয়েছে।
অনুসন্ধানে ও এলাকাবাসীর সূত্রে জানা গেছে, ইয়াবাসহ আটক মায়েনের অন্যতম সহযোগি বড়ছড়া এলাকার জাফরের ছেলে জাহিদ হোসেন ওরফে ইমন। ইমনের বড় ভাই রুবেলের বিরুদ্ধেও রয়েছে মাদক কারবারের অভিযোগ। এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে ইয়াবা কারবারে রুবেলের আলিশান জীবন-যাপন। নিজেকে সিএনজি চালক দাবী করলেও বেশ কয়েকটি সিএনজি টেক্সী ও জমির মালিক রুবেল। কিনেছে নৌকাও। রুবেলের বেশির ভাগ ব্যবসা দেখা শুনা করেন ছোট ভাই ইমনও। ইমনও আটক মায়েনের অন্যতম সহযোগি বলে জানা গেছে। মায়েনের মতো জনি ও ইমনের বিরুদ্ধেও রয়েছে ইয়াবা কারবারের অনেক অভিযোগ। মায়েনের অল্প বয়সী সহযোগি জাহিদের জীবনযাপন এখন আলিশান। অল্প সময়ে কিনেছেন বড়ছড়া এলাকায় কয়েকটি দোকানও। সম্প্রতি সময়ে জীপ গাড়ির মালিকও জাহিদ। চলেন রাজার হালে। দৃশ্যমান কোন চাকরি বা ব্যবসার উৎস না থাকলেও অল্প সময়ে বহু সম্পদের মালিক জাহিদ ওরফে ইমন। এলাকায় জাহিদের উত্থান রহস্যজনক বলেও জানা গেছে। এছাড়া আটক মায়েনের সহযোগি হিসেবে রয়েছে জয়নাল ওরফে মাংকি। মাংকি জয়নাল ইয়াবা কারবারের সুবাদে মায়েনের পার্টনার বনে যান দীর্ঘদিন আগে। ইয়াবাসহ মায়েন আটক হলেও এখনো অধরা তার সহযোগিরা। একই সাথে অনেক ইয়াবা কারবারি দরিয়ানগরস্থ বড়ছড়া এলাকায় ইয়াবা কারবারের আস্তানা গেড়েছে বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসীর সূত্রে জানা গেছে- ইয়াবাসহ আটক মায়েনের পুরো পরিবার ইয়াবা কারবারে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে তারা ইয়াবা কারবার করে যাচ্ছে এলাকায়। তার পরিবারে কেউ ব্যবসা আবার কেউ ইয়াবা সেবনকারী। এমনকি মায়েনের বোন কৌহিনূর ওরফে বুতিও ইয়াবা সরবরাহে সরাসরি জড়িত রয়েছে। কৌহিনূরের স্বামীও ইয়াবাসহ আটক হয়ে বর্তমানে কারাগারে।
এছাড়া বড়ছড়া এলাকায় কয়েকজন শীর্ষ ইয়াবা কারবারির মধ্যে রয়েছে আবুল কাশেমের ছেলে বদিউল আলম (৩২)। বহু বছর ধরে বড়ছড়া এলাকায় অবস্থান করে রমরমা ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে বদিউল আলম। এলাকায় তিনি ইয়াবা ভেন্ডার হিসেবে বেশ পরিচিত। তার বিরুদ্ধে ইয়াবা মামলাও রয়েছে। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকলেও এখন এলাকায় ফিরেছে এই ইয়াবা ভেন্ডার। বড়ছড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক জয়নালও (৩৭) ইয়াবা কারবারে সম্পৃক্ত। এলাকায় বেশ নামডাক রয়েছে লায়লানীর ছেলে জয়নালের। দৃশ্যমান কোন ব্যবসা না থাকলেও ইয়াবার টাকায় এলাকায় আলিশান জীবন যাপন জয়নালের। জয়নালের বিরুদ্ধে মানবপাচার মামলাও আছে।
একই এলাকার খালেকের ছেলে ইসমাইল (৪০), কামাল (২৭), ইকবাল (৩৫) ইয়াবা কারবারে জড়িত রয়েছে বলে এলাকায় বেশ জনশ্রুতি। খালেকের বড় ছেলে ঈসমাইলও (৪০) ইয়াবার বড় ভেন্ডার। ঈসমাইল ৬ হাজার ৫০০ ইয়াবাসহ আটক হয়ে কারাভোগও করেন। বর্তমানে এলাকায় অবস্থান করে চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা কারবারও। ইয়াবাসহ আটকের পর কারাগার থেকে বের হয়ে এখন ১২নং ওয়ার্ডের শ্রমিকলীগের নেতা পরিচয়ও বহন করে যাচ্ছে ঈসমাইল।
বড়ছড়া এলাকার আব্দু সালামের ছেলে আমির হোসেন (৩৪), মো. জাফরের ছেলে সিএনজি চালক রুবেল (৩৩), আলি হোসেনের ছেলে বেলাল হোসেনও (২৭) ইয়াবা কারবারে জড়িত। তবে এরমধ্যে কয়েকজন ইয়াবা কারবারের হাল ছেড়েছে বলে শুনা যাচ্ছে।
একই এলাকার জামাল হোসেনও বদিউল আলমের ইয়াবা মামলার পার্টনার। জামাল ইয়াবা নিয়ে আটক হয়েছিল। বর্তমানে এলাকায় ফিরে আবার ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।
ইয়াবা কারবার থেমে নেই আব্দুল সালাম বাইলার ছেলে জাকির হোসেন (২৩), ছৈয়দ করিম (২৭), আব্দুল লতিফ ও বর্মায়া নুরুল আলম, রুমান, মৃত মো. আলীর ছেলে আনছার, মুফিজুর রহমানের ছেলে নুর মোহাম্মদ (৩৭), নুর আলম (২৫) ও আক্তার কামালের ছেলে বেলা হোসেনের (২৪)। এরমধ্যে বেশ কয়েকজন খুচরা ব্যবসায়ী থাকলেও নুর মোহাম্মদ ইয়াবা ভেন্ডার হিসেবে বেশ পরিচিত এলাকায়।
শহর থেকে একটু দূরে হওয়ায় এলাকাটি প্রায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে নেই বলে জানা গেছে। এই সুযোগে সেখানে ইয়াবা কারবারিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে উঠেছে। এরমধ্যে অনেকে ইয়াবা মামলার আসামীও। অনেকে কারাগার থেকে বের হয়ে জমজমাটভাবে চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা ব্যবসা। দৃশ্যমান কোন আয় না থাকলেও এলাকায় তারা আজ রাজার হালে।
বেশ কয়েকজন এলাকাবাসী জানান, বড়ছড়া এলাকায় অনেক ইয়াবা কারবারি রয়েছে। নতুন নতুন ইয়াবা ব্যবসায়ী যোগ হচ্ছে এই এলাকায়। সাগর পথ ও মেরিন ড্রাইভ রোড সহজ হওয়ায় ইয়াবা কারবারিরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দরিয়ানগর এলাকা বেঁচে নিয়েছে। বুঝতেও পারবে না কেউ এখানে অর্ধশত ইয়াবা কারবারি অবস্থান করে। গভীররাত হলে ইয়াবা কারবারির দৌড় বেড়ে যায়। অনেকেই দামি গাড়ি ও সিএনজি টেক্সী নিয়ে গভীররাতে এলাকা ইয়াবা মজুদও করে কৌশলে পাচার করে। এমনকি মুফিজুর রহমানের বাড়িটি ইয়াবা মজুদের কারখানা বলেও এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে। মুফিজের ছেলেরা সিএনজি টেক্সীযোগে গভীররাতে ইয়াবা খালাসের বিষয়টি এলাকার অনেকেই অবগত রয়েছে।
বড়ছড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের এক নেতা বলেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে যখন পুলিশ বেশি অভিযান চালাচ্ছিল তখন বড়ছড়া ও দরিয়ানগর এলাকার অনেক চিহ্নিত ইয়াবা কারবারি আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল। আত্মগোপন থেকেই ইয়াবা কারবার চালিয়েছিল তারা। টেকনাফে মেজর সিনহা’র ঘটনার পর যখন পুলিশের অভিযান থেমে যায় তখন এলাকায় ফিরেছে এসব মাদক কারবারিরা। এখন তারা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরছে আর ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে জমজমাটভাবে।
তিনি বলেন, বড়ছড়া এলাকায় ইয়াবা ভেন্ডার হিসেবে বেশ পরিচিতি রয়েছে মায়েনের পুরো পরিবার, বদিউল আলম, ঈসমাইল, লায়লানীর ছেলে জয়নাল, কামাল, রুবেল, মাংকি জয়নাল ও নুর মোহাম্মদের। তাদের বিষয়ে পুরো এলাকাবাসী অবগত রয়েছে।
বড়ছড়া সমাজের এক নেতা বলেন- বহুবছর ধরে এলাকায় গুঞ্জুন ছিল মায়েন ইয়াবা কারবারে জড়িত। তার রয়েছে ইয়াবা সিন্ডিকেটও। অবশেষে সেই মায়েন ইয়াবাসহ আটক হয়েছে। ইতিমধ্যে বড়ছড়া এলাকার বেশ কয়েকজন ইয়াবাসহ আটক হয়েছে। কিন্তু তারা জামিনে বের হয়ে ফের ইয়াবা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। এমন অনেক ইয়াবা কারবারি আছে বড়ছড়া এলাকায়; যাদের বিরুদ্ধে মামলা বা অভিযোগ নেই। কিন্তু তারা কৌশলে ইয়াবা কারবারি করে যাচ্ছে। অনেকেই দলীয় পরিচয়ে তাদের আশ্রয়ও দিচ্ছে। এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা দরকার; এসব মাদক কারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার।
দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন- পুলিশের নিয়মিত অভিযানে ইয়াবাসহ মাদক কারবারিরা আটক হচ্ছে। ধরাও পড়ছে অনেক মাদক। বড়ছড়া এলাকাসহ সবখানে পুলিশের নজরদারী রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যেও ভিত্তিতে অপরাধীদের যেকোন সময় আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশ এই বিষয়ে কাজ করছে।