বিশেষ প্রতিনিধি
পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশে কবরস্থান ও চাষাবাদের খালি জমি। উত্তর পাশে ২/৩ টি বাড়ি ছাড়া আশে-পাশে কোন বসতি নেই। চারপাশে সুনশান নিরবতা। এর মধ্যেই কবরস্থানের পাশে আনুমানিক দেড় একর জায়গায় সীমানা প্রাচীর দিয়ে মসজিদ ও মাদ্রসার আদলে স্থাপনা নির্মাণ কাজ চলছে।
প্রায় এক বছর ধরে সীমানা প্রাচীর দিয়ে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে মসজিদ ও মাদ্রাসার আদলে স্থাপনা নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে আসলেও এলাকাবাসী এই স্থাপনার বিষয়ে কিছুই জানেন না। গ্রামবাসীর অগোচরে গড়ে উঠা এই স্থাপনা এলাকাবাসীর কাছে এক রহস্য।
গোপনে কার্যক্রম পরিচালনা, স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা না থাকা, অর্থের উৎস ও পরিকল্পনা গোপন রাখা, এসব স্থাপনা নির্মাণের পেছনে কারা জড়িত তা গোপন করা, গভীর রাতে অচেনা ও রোহিঙ্গাদের আনাগোনাসহ নানা কারণে স্থানীয়দের মধ্যে শঙ্কা তৈরী হয়েছে।
কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের মৌলভীপাড়ার শেষ প্রান্তে পিএমখালী ইউনিয়নের ডিকপাড়ার শুরুতে মোবারক কোম্পানির ইটভাটার পাশে কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় এই রহস্যজনক স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর মৌখিক অভিযোগে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ৫/৬ জন শ্রমিক নির্মাণাধীন স্থাপনাতে রং এর কাজ চালাচ্ছেন।
শ্রমিকরা জানান, বাসটার্মিনাল এলাকার মৌলভী সামশু নামের এক ব্যক্তি তাদের কাজ দিয়েছেন। মাঝে মধ্যে তিনি আসেন, না হয় টাকা পাঠান। এর বাইরে তারা কিছুই জানেন না। মাদ্রাসার আদলে তৈরি দ্বিতল ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন হাফেজ সেলিম নামের এক ব্যক্তি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কারা এসব করছে তা আমি জানি না।’ আমাকে চলতি অক্টোবর থেকে মসজিদের ইমাম ও হাফেজখানার জন্য শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এখনো মসজিদ চালু হয়নি। ৫ জন শিশুকে নিয়ে হাফেজখানা চালু করা হয়েছে।’ মসজিদ-মাদরাসার নাম, অর্থের উৎস, কারা এসব পরিচালনা করছেন তা তিনি জানেন না বলে দাবি করেন। তাকে কে নিয়োগ দিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে এক পরিচিত ব্যক্তি তাকে এখানে চাকরির কথা বলে পাঠিয়েছেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থাপনাটির যাবতীয় কার্যক্রমের সাথে জড়িত মাওলানা শামসুল আলম নামের এক ব্যক্তি। যোগাযোগ করা হলে তিনি সেখানে জড়িত নন দাবি করে বলেন, ‘আমাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন কমিটির সভাপতি নজির আহমদ। সে হিসেবে আমি কাজ করি।’
তিনি দাবি করেন, ‘এলাকাবাসী অল্প টাকা-পয়সা দিয়ে জমি কিনে মসজিদ-মাদরাসা গড়ে তুলছেন। এখনও মসজিদ-মাদরাসার নাম দেয়া হয়নি। সবকিছুই দেখাশুনা করেন দক্ষিণ ডিকপাড়ার সাবেক ইউপি সদস্য সিরাজ এর পুত্র নজির আহমদ। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে নজির আহমদ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।
এক পর্যায়ে তিনি এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে কথা না বলে সরাসরি কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু এরপর কয়েকদিন ধরে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এলাকাবাসী জানান, এক বছর ধরে এখানে স্থাপনা নির্মাণ কাজ চললেও আসলে কারা এসব নির্মাণ কাজে জড়িত তা কেউ জানেন না। শ্রমিকরা নিজেরা নির্মাণ কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। মাঝে মধ্যে এক মৌলভী এসে টাকা দিয়ে যান এবং কাজ তদারকি করেন। এছাড়া কয়েকজন হুজুর প্রকৃতির লোক আসেন নোয়া মডেলের প্রাইভেট গাড়িতে। তাদের অধিকাংশ সময় রাতের বেলায় আসতে দেখা যায়। আনাগোনা রয়েছে রোহিঙ্গাদেরও।
এলাকাবাসী আরও জানান, গোপনে কার্যক্রম পরিচালনা, স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা না থাকা, অর্থের উৎস ও পরিকল্পনা গোপন রাখা, এসব স্থাপনা নির্মাণের পেছনে কারা জড়িত তা গোপন করা, গভীর রাতে অচেনা ও রোহিঙ্গাদের আনাগোনাসহ নানা কারণে জনমনে রহস্যের পাশাপাশি শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, মসজিদ-মাদরাসা হলে তো এলাকার মানুষের জানার কথা। কয়েক কোটি টাকা কোথা থেকে আসছে তাও জানার কথা। কিন্তু কারা এসব স্থাপনা করছে, টাকার উৎস কি এবং এখানে আদৌ কি করা হবে সেসব বিষয়ে পুরোপুরি অন্ধকারে এলাকাবাসী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজ কমিটি ও সচেতন মহল।
ওই এলাকার উত্তর ডিকপাড়া জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফিরোজ আলম বলেন, ‘শুনেছি চট্টগ্রাম থেকে কিছু লোক এসে মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ করছে। আমার জানামতে, সেখানে গ্রামবাসী নিয়ে কোন পরিচালনা কমিটি নেই।’ এছাড়া কারা এসব করছে তাও তিনি বিস্তারিত জানেন না বলে জানান।
দক্ষিণ ডিকপাড়ার মুরব্বি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নজির আহমদ সওদাগর বলেন, ‘কারা এখানে এসে মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ করছে, তাদের উদ্দেশ্য কি তা তিনি জানেন না।’
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, ‘হঠাৎ করে মসজিদ-মাদরাসা গড়ে তোলা হচ্ছে। এসব কারা করছে, টাকার উৎস কি এলাকাবাসী জানে না।’ এছাড়া এটির কোন নাম বা পরিচালনা কমিটিও নেই বলে জানান তিনি।
বর্তমান স্থানীয় ইউপি সদস্য নুরুল হুদাও এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তিনি বলেন,’এটি কেউ জানে না। এটি এক রহস্য। চেয়ারম্যান হয়তো জানতে পারে।’
যোগাযোগ করা হলে পিএমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রহিম বলেন, ‘এ ধরনের একটি মসজিদ-মাদরাসা হচ্ছে বলে শুনেছি, তবে কারা করছে-কি হচ্ছে তা জানিনা। তাছাড়া আমার মেয়াদও শেষ।’