ফরিদ মোহাম্মদ ও ফয়সাল রিয়াদ:
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ভেসে আসা বর্জ্য এখনো অপসারণ হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন। তবে জেলা প্রশাসনের মহিলা কর্মী, কয়েকটি সামাজিক সংগঠকের কর্মীসহ স্থানীয়রা কবিতা চত্বর, লাবণী ও সুগন্ধা পয়েন্টের বেশিরভাগ বর্জ্য পরিস্কার করেছে।
কিন্তু কলাতলী পয়েন্ট, দরিয়া নগর, হিমছড়ি ও ইনানী সৈকতের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য এখনও পড়ে আছে। এসব বর্জ্য থেকে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। যার কারণে ভারী হয়ে উঠেছে আশপাশের পরিবেশ।
দরিয়ানগর এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক জানান, গত শনিবার থেকে সৈকত থেকে নানা ধরণের প্লাস্টিক, বোতল, হাড়ি-পাতিল, কাঠ ও ছেড়া জাল ভেসে আসে। ঢেউয়ের স্রোতে হতাহত ২০-২৫টি কাছিমও আসে। আহতগুলোকে অবমুক্ত করা হলেও মৃত কাছিমগুলো ২দিন পড়ে থাকে। পরে ৭/৮ কাছিম স্বেচ্ছায় স্থানীয় যুবক পারভেজসহ কয়েকজন মাটিতে পুঁতে ফেলে। সোমবার জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসে স্থানীয়দের বর্জ্য সরানোর জন্য সুরক্ষা সামগ্রী দেন। কিন্তু বর্জ্যগুলো পরিস্কার করা হয়নি।

হিমছড়ি প্যারাসেলিং পয়েন্টের হারুন রশিদ বলেন, বিভিন্ন সময় সাগর থেকে ময়লা ভেসে আসে। কিন্তু এই প্রথম বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ভেসে আসে। বর্জ্যরে সাথে আঘাতপ্রাপ্ত ও মৃত কাছিম ভেসে আসার বিষয়টি রহস্যজনক।
হিমছড়ি পয়েন্টে বাসিন্দা জয়নাব বেগম জানান, প্লাস্টিক ও বোতল কুঁড়িয়ে তিনি বিক্রি করে ৭-৮ হাজার টাকা পেয়েছেন। সরকারিভাবে এখনও বর্জ্য সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সৈকতে হতাহত কাছিম ও বর্জ্য ভেসে আসার কারণ উদঘাটন করতে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসন। কমিটি বিষয়টি তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দিবেন।
এদিকে সৈকতকে পরিচ্ছন্ন রাখতে ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসন প্রায় ১১টি পরিবেশবাদী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেছে। বৈঠকে বুধবার এসব সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে সৈকতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান করার সিদ্ধান্ত হয়।

জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বলেন, কিছু কিছু পয়েন্টে ইতোমধ্যে পরিস্কার করা হয়েছে। তবে বর্জ্যরে পরিমাণ বেশি হওয়ায় সব পয়েন্টে পরিস্কার করা সম্ভব হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের আহ্বানে পরিবেশবাদী তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা বর্জ্য পরিস্কারের এগিয়ে আসার সম্মতি দিয়েছে। বুধবার সকাল থেকে সৈকতের সকল পয়েন্টে বর্জ্য পরিস্কার শুরু হবে।
কক্সবাজারে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা ১১ টি পরিবেশবাদী সংগঠন যৌথভাবে সৈকতে ভেসে আসা বর্জ্য পরিস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সব সংগঠন একসাথে হয়ে ‘সোশ্যাল এক্টিভিস্ট ফোরাম’ নাম দিয়ে পরিস্কারের উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংগঠনগুলো হল- এনভায়রনমেন্ট পিপল, ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস), কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলন, টিম কক্সবাজার, কক্সিয়ান এক্সপ্রেস, দরিয়ানগর গ্রীণ ভয়েস, প্লাস্টিক ব্যাংক বাংলাদেশ, ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস, উইকেন, তারুণ্যের প্রতিবাদ ও পরিবেশ বিক্ষণ।
লাবণী পয়েন্ট থেকে সুগন্ধা পয়েন্টে পরিস্কারে নিয়োজিত থাকবে প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদের নেতৃত্বে এনভায়রনমেন্ট পিপল ও প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুনের নেতৃত্বে ইয়েস।

দরিয়ানগর থেকে হিমছড়ি পয়েন্টে সবচেয়ে বেশি আবর্জনা ভেসে এসেছে। এই পয়েন্টে পারভেজ মোশারফের নেতৃত্বে পরিস্কারের দায়িত্বে থাকবে ‘দরিয়ানগর গ্রীণ ভয়েস’।
কলাতলী থেকে দরিয়ানগর পর্যন্ত পয়েন্টে পরিস্কারে নিয়োজিত থাকবে আনছারুল করিমের নেতৃত্বে কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলন।
কলাতলী পয়েন্ট থেকে সুগন্ধা পয়েন্ট সৈকতে নিয়োজিত থাকবে নাজমুল হক ও মিজবাহ মাহমুদ মিশকাতের নেতৃত্বে ‘টিম কক্সবাজার’।
লাবণী পয়েন্ট থেকে ডায়বেটিক পয়েন্ট পর্যন্ত সৈকতে নিয়োজিত থাকবে ইরফানুল হাসানের নেতৃত্বে ‘কক্সিয়ান এক্সপ্রেস’। ডায়বেটিক পয়েন্টে আফরিন আরিয়ান সায়মনের নেতৃত্বে পরিস্কারের দায়িত্বে থাকবেন ‘তারুণ্যের প্রতিবাদ’।
নাজিরারটেক থেকে ডায়বেটিক পয়েন্টে শাকির আলমের নেতৃত্বে পরিচ্ছন্নতায় নিয়োজিত থাকবে প্লাস্টিক ব্যাংক বাংলাদেশ।
নাজিরারটেক সৈকতে থাকবে ওমর ফারুক জয়ের নেতৃত্বে উই কেন। ডায়বেটিক পয়েন্টে থাকবে শান্ত নূরের নেতৃত্বে ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস। লাবণী পয়েন্টে থাকবে ছাত্রনেতা তন্ময় ও মুক্তাদিল জয়ের নেতৃত্বে পরিবেশ বিক্ষণ।
সোস্যাল এক্টিভিস্ট ফোরামের সমন্বয়ক এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসনের একার পক্ষে সৈকতের এতবিপুল বর্জ্য পরিস্কার করা সম্ভব নয়। তাই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য্য ফিরিয়ে আনতে বুধবার সকাল থেকে সৈকতে নামবে পরিবেশবাদী ১১ টি সংগঠনের তিন শতাধিক তরুণ। এই কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে সমন্বয় করবে জেলা প্রশাসন। বুধবার সকাল ১০ টায় দরিয়ানগর পয়েন্টে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন এ কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান জাহিদ খান বলেন, স্বেচ্ছাসেবকদের সুরক্ষার জন্য মেডিকেল টিম, ব্যাগ, গ্লাভস সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট থাকবে।
বাংলাদেশ সময় ২১৩৬ ঘণ্টা, ১৪ জুলাই ২০২০
এফএম/এফআর/আএন