বিশেষ প্রতিবেদক:
মালয়েশিয়া পাচারের সময় ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের জলসীমায় ভাসমান ৮ শতাধিক মানবপাচারে জড়িতের ঘটনায় ঘুরেফিরে আসছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের তালিকাভূক্ত শীর্ষ মানব ও মাদক পাচারকারী কক্সবাজারের টেকনাফ শাহপরীরদ্বীপের মো. ইসমাইলের নাম। উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের তথ্যে উঠে এসেছে এই শীর্ষ মানবপাচাকারীর নামও।
মিয়ানমার থেকে এখনো প্রতিনিয়ত ইয়াবা আনছে শীর্ষ এই ইয়াবা ব্যবসায়ী। এতো অপকর্ম করেও ইসমাইল এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ৩১ জনের একটি শীর্ষ মানবপাচারকারীর তালিকায় রয়েছে ইসমাইলের নাম। এই ৩১ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযানে ‘হিট লিস্টে’ আছে বলে জেলা পুলিশের শীর্ষ এক কর্মকর্তার সূত্রে জানা গেছে।
টেকনাফ থানার ওসি প্রদিপ কুমার দাশ জানিয়েছেন, শাহপরীর দ্বীপের ইসমাইল একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য। টেকনাফের বাহারছড়া থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত উপকূলে ইসমাইল ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করে আসছে। তিনি ইয়াবা ব্যবসার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ফুসলিয়ে সাগর পথে মানবপাচার নিয়ন্ত্রন করেন। ইসমাইলের বিরুদ্ধে হত্যা, মানবপাচার, ইয়াবা, বিদেশি নাগরিক সম্পর্কিত আইন, পুলিশের উপর হামলাসহ নারী নির্যাতনের এক ডজন মামলা আছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সাল থেকে সাগর পথে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, লিবিয়া সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রোহিঙ্গাদের পাচার করে আসছেন ইসমাইল। শীর্ষ এই আন্তর্জাতিক মানবপাচাকারীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় মানবপাচারের ৪টি মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। শাহপরীর দ্বীপের হাজী সালেহ আহম্মদ প্রকাশ ছালেহ হাজীর পুত্র ইসমাইল একজন শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীও। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এনে বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গায় পাচার করে আসছে। ইসমাইল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকা ভুক্ত ইয়াবা কারবারী।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী ও মার্চ মাসে ৪টি ট্রলারে প্রায় ১ হাজার রোহিঙ্গা সাগর পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছিলো। সেই ঘটনার তার মূলে ছিলো শাহপরীর দ্বীপের ইসমাইল। মালয়েশিয়া যাওয়া জন্য মিয়ানমারের ৪টি বড় ট্রলার ঠিক করে ইসমাইল। আর মালয়েশিয়ায় দালাল চক্রের সাথেও নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে ইসমাইলের।
গভীর সাগরে ট্রলারে ইয়াবা আনা ও রোহিঙ্গাদের পাচারে জন্য ইসমাইলের সহযোগী হলো টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালি পাড়ার সাইফুল, আজিম উল্লাহ (২২) ও উখিয়ার পালংখালীর জামতলীর ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরের বাসিন্দা আব্দুস সালাম, টেকনাফের বাহারছড়ার শামলাপুর ২৫ নম্বর রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা আজিম উল্লাহ, আব্দুল আমিন ও হেলাল উদ্দিন। পুলিশের দুটি অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে ইসমাইলের ৪ সহযোগী আজিমউল্লাহ, সালাম, আমিন ও হেলাল নিহত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইসমাইল সরাসরি মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের শাহপররীর দ্বীপের নিয়ে আসে। এই রোহিঙ্গারা আসার পথে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা নিয়ে আসে। ইসমাইলের ভাই জিয়াউর রহমানও ইসমাইলের মাদক ও মানবপাচার চক্রে জড়িত। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের তথ্যের ভিত্তিতে পাচারকারী ইসমাইল ও তার সহযোগীদের তথ্য বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি সংস্থা এই ব্যাপারে কাজ করছে।
মানবপাচারের ঘটনায় ইসমাইলের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ২০ নভেম্বর, ২০১৩ সালের ৩০ জুন টেকনাফ থানায়, ২০১৩ সালের ২১ আগস্টে ৩টি মামলায় অভিযোগ পত্র দেয়া হয়েছে। মানবপাচারের ঘটনায় ইসমাইলের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২ নভেম্বর হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানার একটি মামলায়ও আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এছাড়া ইসমাইলের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় ৩টি মাদকদ্রব্য আইনে ও ২টি হত্যা মামলা রয়েছে। এছাড়াও অবৈধ অস্ত্র ও পুলিশের উপর হামলার প্রধান আসামী ইসমাইল। ইসমাইলের ভাই জিয়াউর রহমান ও তার সহযোগী সাইফুলের বিরুদ্ধেও মানবপাচারের একাধিক মামলা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সদস্য ইসমাইলের ১ ডজন মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও তিনি ধরাছোয়ার বাইরে। এখনো মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গা সংগ্রহ করতে টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাকে দেখা গেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক একটি বড় ইয়াবা সিন্ডিকেট তৈরি করেছে এই ইসমাইল।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ পুলিশ ফাড়ির আইসি দিপক বিশ্বাস জানিয়েছেন, ইসমাইল তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী ও মানবপাচারকারী। তার বিরুদ্ধে একাধিক মানবপাচার ও মাদকের মামলা রয়েছে। তাকে ধরার জন্য তৎপরতা অব্যাহত আছে।
ওসি প্রদীপ কুমার দাশ জানান, ইসমাইলকে ধরতে পুলিশ একাধিক অভিযান করেছে। টেকনাফের বাহারছড়া ও শিলখালীকে দুটি অভিযানে ইসমাইলের বাহিনীর সাথে পুলিশের গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। ইসমাইলের আধুনিক অস্ত্রও রয়েছে। তিনি পুলিশকে গুলি করে পালিয়ে যায়। তবে পুলিশের দুটি অভিযানে গোলাগুলিতে ইসমাইলের ৪ সহযোগী নিহত হয়। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমান ইয়াবা ও আগ্নেয়াস্ত্র।
লিবিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত গডফাদাররা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) নজরদারিতে আছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান। গত বুধবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি।
তিনি জানান, মানবপাচারের ঘটনায় জড়িত গডফাদারদের তিনজনের সম্পর্কে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই আমরা কিছু বলতে চাচ্ছি না। মানবপাচারকারীদের বিষয়ে সরকারের দুটি মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে আমরা দুটি তালিকা পেয়েছি। পাচার হওয়া ভুক্তভোগী, তাদের পরিবার ও বিভিন্ন দেশের এম্বাসির কাছ থেকে অনেক নাম পাওয়া গেছে। তাদেরকেও আমরা নজরদারিতে রেখেছি।’
বাংলাদেশ সময় ১৮২৬ ঘণ্টা, ২১ জুলাই ২০২০
আএম/আএন