কক্সবাজারের চকরিয়ায় ছাত্রদল নেতা ইসফাতুল ইসলাম জিসানকে (২৮) তুলে নেওয়ার চার ঘণ্টা পর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ভাইরাল হওয়া একটি অডিও কল রেকর্ড নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই অডিওতে এক ব্যক্তিকে জিসানকে ‘১৪ টুকরা’ করার হুমকি দিতে শোনা যায়। এদিকে পরকিয়ার জেরে এ হত্যাকাণ্ড হতে পারে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
নিহত জিসান কাকারা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ লোটনী এলাকার নাজেম উদ্দিনের ছেলে। তিনি কাকারা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। হত্যার ঘটনায় এরই মধ্যে সাতজনকে আসামি করে মামলা করেছে জিসানের পরিবার।
জিসানের মরদেহ উদ্ধারের পর সোমবার সকালে নিহতের বড় ভাই মো. কায়সার ও আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া মিজান নামের এক ব্যক্তির কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ফাঁস হওয়া ওই অডিওতে মিজানকে বলতে শোনা যায়, ‘জিসানকে ধরার জন্য ৫০ জন লোক লাগিয়ে রাখা হয়েছে।’ কথোপকথনের একপর্যায়ে ওই ব্যক্তিকে জিসানকে ‘১৪ টুকরা’ করার হুমকি দিতেও শোনা যায়। একই সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, অর্থ ও ক্ষমতার কথাও বলতে শোনা যায় অডিওতে।
অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার বেলা ১১টার দিকে মিজানের পরিবারের চার নারী সদস্য ও বাড়ির কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ।
এ বিষয়ে চকরিয়া থানার পরিদর্শক (ওসি) মোহাম্মদ আরিফুর রহমান মঙ্গলবার বলেন, ‘ঘটনার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যাদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল, তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’ ভাইরাল অডিও প্রসঙ্গে ওসি বলেন, ‘বক্তব্যটি আমলে নিয়ে যাচাই-বাছাই করছি। এটি আমাদের তদন্তের অংশ।’
তবে স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, অডিও বক্তব্য ফাঁস হওয়া মিজান চকরিয়া পৌরসভার সবুজবাগ এলাকায় থাকেন। তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত দাবি করলেও তিনি কোনো পদবিতে নেই। অপরদিকে তার বড় মো. জাকারিয়া কাকারা ইউনিয়ন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা। তাদের আরও দুই ভাই রয়েছেন। তারা সবাই প্রবাসী।
নিহত জিসানের চকরিয়া জনতা শপিং কমপ্লেক্সে ‘আপডেট কালেকশন’ নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা দাবি করা মিজানের বোন রাজিয়া সুলতানারও ওই শপিং কমপ্লেক্সে দোকান রয়েছে বলে জানা যায়। সেই সুবাদে জিসান ও রাজিয়ার মধ্যে পরিচয় ছিল। মিজানের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে জিসান পূর্ব পরিচিত ছিল। তাদের মধ্যে ১২ লাখ টাকার লেনদেন নিয়ে সম্প্রতি থানায় একটি এজাহারও দায়ের করেন রাজিয়া সুলতানা।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে রাজিয়া সুলতানার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে কল দিলে বন্ধ পাওয়া। অপরদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে জিসানের বড় ভাই মো. কায়সারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যায়।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) মো. অহিদুর রহমান বলেন, মিজানের পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে জিসানের মধ্যে পূর্ব পরিচয় ছিল। তাদের মধ্যে লেনদেনও হয়েছে। তাছাড়া পরকিয়া সংক্রান্ত ঘটনাও থাকতে। সে কারণে হত্যকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে। সাতজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে পুলিশ তদন্ত করছে।’
এর আগে নিহতের বড় ভাই মো. কায়সার বলেন, ‘আমার ভাইকে অপহরণের পর চকরিয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সবুজবাগ এলাকার ‘কবির টাওয়ারে’ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কচ্ছপিয়া ঢালা এলাকায় ফেলে রেখে যায় হত্যাকারীরা।’
চকরিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি রেজাউল করিম বাপ্পী বলেন, ‘জিসান ছাত্রদলের একজন উদীয়মান ও সক্রিয় নেতা ছিলেন। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার না হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে রাজপথে কঠোর আন্দোলন করা হবে।’
প্রসঙ্গত, গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে চকরিয়া সদর থেকে কাকারা ইউনিয়নের লোটনী গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন জিসান। পথে কাকারা সাবের সদর বাজারের (মাঝের স্টেশন) একটি দোকানের সামনে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে করে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। এর প্রায় চার ঘণ্টা পর রাত আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কচ্ছপিয়া এলাকায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জিসানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সূত্র-এশিয়া পোস্ট